বুধবার, ২৮শে জুলাই, ২০২১ ইং, ১৩ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৮ই জিলহজ্জ, ১৪৪২ হিজরী
বুধবার, ২৮শে জুলাই, ২০২১ ইং

ভেদরগঞ্জ স্ত্রী-সন্তানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, বৃদ্ধর পাশে দাঁড়ালেন দারোগা

ভেদরগঞ্জ স্ত্রী-সন্তানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, বৃদ্ধর পাশে দাঁড়ালেন দারোগা

শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ তারাবনিয়া এলাকায় নিজের ছেলে, স্ত্রী ও মেয়ের হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য কালা মিয়া দেওয়ান (৬৮) নামের এক বৃদ্ধ গত ৭ জুলাই সখিপুর থানায় অভিযোগ করেন। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ও অভাব-অনটনের কারণে নিজ সম্পত্তি বিক্রি করতে চাইলে স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেন বলে অভিযোগে জানান তিনি।

অভিযোগ পেয়ে তদন্ত করতে যান সখিপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নাজমুল ইসলাম। তিনি দৈনিক রুদ্রবার্তাকে বলেন, কালা মিয়ার অভিযোগ পেয়ে তদন্ত করেছি। ঘটনার সত্যতা পেয়ে ঘটনাস্থলে গেলে খবর পেয়ে তার স্ত্রী ও মেয়ে পালিয়ে যান। তিনি একজন বৃদ্ধ ও অসুস্থ। তার জীর্ণ অবস্থা দেখে তাকে দুটি পাঞ্জাবি, দুটি লুঙ্গি, দুটি গেঞ্জি ও এক জোড়া জুতা কিনে দিই।

কালা মিয়ার ছেলে, হানিফ দেওয়ান দৈনিক রুদ্রবার্তাকে বলেন, আমি চেষ্টা করি বাবাকে দেওয়ার জন্য কিন্তু আমি কিছু দিলে আমার মা ও বোন কামেলা বেগম আমাকে মারতে আসে। আমার সঙ্গে ঝগড়া করে। অশান্তি করে আমার বাড়িতে এসে। তাই বাবাকে দেখি না বা দেখার চেষ্টা করি না।

কালা মিয়া দেওয়ান জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুর থানার দক্ষিণ তারাবুনিয়া ইউনিয়নের প্রধানীয়াকান্দি মৃত সোনা মিয়া দেওয়ানের ছেলে। ৪৫ বছরের দাম্পত্য জীবনে তার স্ত্রী ফিরোজা বেগম (৫৫)। তিন ছেলের একজন হানিফা দেওয়ান (৩৮) ও এক মেয়ে কামেলা বেগম (৩২)।

থানার অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, কালা চান মিয়া ৪৫ বছর আগে ফিরোজা বেগমের সঙ্গে সংসার শুরু করেন। তাদের তিন ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। বিয়ের পর থেকে বিভিন্ন সময় পারিবারিক ঝগড়া হতো। তার মধ্যে মানিয়ে নিয়ে চলছেন তারা। কিন্তু আড়াই বছর ধরে স্ত্রী ফিরোজা ও মেয়ে কামেলা একসঙ্গে থাকলেও কালা মিয়াকে তারা দেখতে পারেন না। এখন শারীরিক অবস্থা ও অভাবের জন্য জায়গাসম্পত্তি বিক্রি করতে চান। কিন্তু তার স্ত্রী ফিরোজা বেগম, ছেলে হানিফ দেওয়ান ও মেয়ে কামেলা বেগম তাকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছেন।

স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে কালা মিয়াকে দেখভাল করে না পরিবারের কেউই। ছেলেরা সহযোগিতা করে না। বেশ কয়েকবার এটা নিয়ে বসলেও কিন্তু মীমাংসা ছাড়া এটি শেষ হয়ে যায়। কিছুদিন আগে কালা মিয়া অসুস্থ হলে রান্নাবান্না করতে পারেননি। চিকিৎসা করাতে পারেননি। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে জমি বিক্রি করে চিকিৎসা করাবেন। কিন্তু ছেলে-মেয়ে-স্ত্রী কেউই তাকে তা করতে দেয় না। বরং তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়।

কালা চান দেওয়ান ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমার পোড়া কপাল। যদি তা না হয়, তাহলে কেন নিজ ছেলে, মেয়ে ও স্ত্রীর নামে থানায় অভিযোগ জানাব? আড়াই বছরের ওপরে আমি এই বয়সে নিজে রান্না করে খাই। জীবন বাঁচাতে এখনো কাজকর্ম করি। হেঁটে হেঁটে গ্রাম থেকে নারকেল কিনে আবার গ্রামে বা হাটে সেই নারকেল বেচে সংসার চালাই।

এসআই নাজমুল ইসলাম দৈনিক রুদ্রবার্তাকে বলেন, কালা মিয়া নিজ পরিবারের কাছে অবহেলিত ও নির্যাতিত। স্ত্রী স্বামীকে বা মেয়ে বাবাকে মারার জন্য হুমকি দেন। এসব অবাক হওয়ার মতো ঘটনা। আমি শুনে ঘটনাস্থলে যাই। আমি যাওয়ার কথা খবর পেয়ে তার স্ত্রী ও মেয়ে পালিয়ে গিয়েছেন। তাই স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেও সত্যতা পেয়েছি। কালা মিয়ার অভিযোগ অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ছোট ছেলেকে নিজের পালের পাঁচটি গরু বেচে বিদেশে পাঠিয়েছি তিন বছর হলো। কিন্তু যাওয়ার পর আজ পর্যন্ত এক মিনিটও আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলেনি। আমি ফোন দিলে ধরে না। কী অপরাধ আমার, তাও বলে না। টাকার অভাবে জামাকাপড়ও কিনতে পারি না। এসআই স্যার জামাকাপড় কিনে দিয়েছেন। আজ অনেক দিন পর নতুন জামাকাপড় পরলাম।

এ বিষয়ে কালা মিয়ার ছেলে হানিফ দেওয়ান (৩৮) মুঠোফোনে দৈনিক রুদ্রবার্তাকে বলেন, আমি চেষ্টা করি বাবাকে দেওয়ার জন্য কিন্তু আমি কিছু দিলে আমার মা ও বোন কামেলা বেগম আমাকে মারতে আসে। আমার সঙ্গে ঝগড়া করে। অশান্তি করে আমার বাড়িতে এসে। তাই বাবাকে দেখি না বা দেখার চেষ্টা করি না। কেন তাকে চিকিৎসা করান না, প্রশ্ন করলে ফোন কেটে দেন তিনি।

দক্ষিণ তারাবনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান শাহ জালাল দৈনিক রুদ্রবার্তাকে বলেন, পারিবারিক এই সমস্যা আমরা বেশ কয়েকবার বসে সমাধান করেছি। কিন্তু বৃদ্ধ মানলেও তার পরিবার মানে না। আইন-আদালত হয়েছে। শুনেছি এখন বৃদ্ধকে মারার জন্য বউ আর মেয়ে ধমকাচ্ছে।

সখিপুর থানার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই নাজমুল ইসলাম দৈনিক রুদ্রবার্তাকে বলেন, কালা মিয়া নিজ পরিবারের কাছে অবহেলিত ও নির্যাতিত। স্ত্রী স্বামীকে বা মেয়ে বাবাকে মারার জন্য হুমকি দেন। এসব অবাক হওয়ার মতো ঘটনা। আমি শুনে ঘটনাস্থলে যাই। তাই স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেও সত্যতা পেয়েছি। কালা মিয়ার অভিযোগ অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।