সোমবার, ১৫ই আগস্ট, ২০২২ ইং, ৩১শে শ্রাবণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১৬ই মুহাররম, ১৪৪৪ হিজরী
সোমবার, ১৫ই আগস্ট, ২০২২ ইং

শরীয়তপুরে শিক্ষকের বিরুদ্ধে নানা অপকর্মের অভিযোগ তবুও পদোন্নতি

শরীয়তপুরে শিক্ষকের বিরুদ্ধে নানা অপকর্মের অভিযোগ তবুও পদোন্নতি

শরীয়তপুর সদর উপজেলা সদর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক কার্ত্তিক চন্দ্র কির্ত্তনীয়ার বিরুদ্ধে নানা অপকর্মের অভিযোগ থাকা সত্বেও সহকারী শিক্ষক থেকে পদোন্নতি পেয়ে প্রধান শিক্ষক হয়েছেন। এ নিয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, কার্ত্তিক চন্দ্র কির্ত্তনীয়ার চাকরী জীবনে ঠিকানা গোপন করে চাকরী নেয়া, নারী কেলেঙ্কারির একাধিক অভিযোগ এসেছে সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে। সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে একাধিক লিখিত অভিযোগ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে পাঠানো হলে তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
শরীয়তপুর সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের অফিস সহায়ক মো. রোকন উজ্জামান জানান, কার্ত্তিক চন্দ্র কির্ত্তনীয়া (৪৯) মাদারীপুর জেলার রাজৈর থানার কলাগাছিয়া গ্রামের নশীরাম কির্ত্তনীয়ার ছেলে। কিন্তু এক খন্ড জমি কিনে ঘর না তুলে শরীয়তপুর সদর উপজেলার চিতলীয়া ইউনিয়নের কাশিপুর গ্রামের ঠিকানায় ১৯৯৯ সালের ৮ জুলাই সদর উপজেলার ১১নং গয়ঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ওই বিদ্যালয়ে ১৩ বছর চাকরি করার পর ২০১২ সালের ১২ জানুয়ারি একই উপজেলায় ৬৫নং কীর্তিনগর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। গত ১৭ জুলাই ৩৩ নং ছোট বিনোদপুর নদীরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পদোন্নতি পেয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছেন।
১১নং গয়ঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি হরিদাস চন্দ্র বলেন, ২০১১ সালের ডিসেম্বরে গয়ঘর গ্রামের একটি মেয়ের সাথে অবৈধ সম্পর্ক গড়ে উঠে কার্ত্তিকের। পরে একদিন রাতে মেয়ের বাড়ি থেকে অপ্রীতিকর অবস্থায় স্থানীয় লোকজন ধরে গণধোলাই দেয় তাকে। তৎকালিন সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করলে কোন ব্যবস্থা নেননি তারা। ঘটনার পর কার্ত্তিক ওই বিদ্যালয়ে আর আসেননি। তিনি বলেন, শিশু শিক্ষার্থীদেরও যৌন হয়রানি করেছে কার্ত্তিক। কার্ত্তিক চন্দ্র কির্ত্তনীয়ার মত শিক্ষক যদি কোন স্কুলে থাকে তাহলে মানুষের নৈতিক চরিত্র স্থলিত হবে। আমি এই ধরনের একজন শিক্ষকের সুবিচার দাবি করি এবং সমাজে যাতে এ ধরনের শিক্ষকরা আর যেন অন্যায় করতে না পারে এই কমনা রাখি।
১১নং গয়ঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লাবনী আক্তার বলেন, আমরা চাই না কোন শিক্ষক শিশু শিক্ষার্থীদের হয়রানিমূলক কোন কিছু করুক, তাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ থাকুক। আমরা চাই শিশু বান্দব পরিবেশে শিক্ষা নিয়ে বেড়ে উঠুক শিশু শিক্ষার্থীরা।
৬৫ নং কীর্তিনগর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বলেন, আমি স্কুলে আসলে কার্ত্তিক স্যারে আমাকে ডেকে নিয়ে বুকে হাত দেয়। আমি বাসা থেকে খাবার আনলে স্যারে খেতে চায়, খাবার দিতে গেলে আমাকে জড়িয়ে ধরে। কার্ত্তিক স্যার অনেক খারাপ লোক।
কীর্তিনগর গ্রামের মেরাজ হাওলাদার, আব্দুল করিম বলেন, সাত বছর ৬৫ নং কীর্তিনগর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে চাকরী করেছেন মাষ্টার কার্ত্তিক। বিদ্যালয়ের পাশেই চন্দ্রপুর দড়িকান্দি গ্রাম। সেই গ্রামের দুলাল হাওলাদারের বাড়িতে ব্যাচলর ভাড়া থাকতেন তিনি। গত ৩ জুলাই রাতে বরিশাল জেলার উজিরপুর থানার হার্ত্তা এলাকা থেকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সুবর্ণা (২১) নামে এক মেয়েকে তার ব্যাচলর বাসায় এনে যৌন হয়রানির চেষ্টা করেন। ৪ জুলাই ভোরে মেয়েটির চিৎকারে আশে পাশের লোকজন ছুটে আসলে লম্পট শিক্ষক কার্ত্তিক চন্দ্র কির্ত্তনীয়া পালিয়ে যায়। সেই থেকে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত রয়েছেন কার্ত্তিক। পরে জানতে পারলাম তার পদোন্নতি হয়ে প্রধান শিক্ষক হয়েছেন তিনি। কি দেশে বাস করি? এতো অপকর্মের পরও পদোন্নতি।
বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য আব্দুল হাকিম ফকির বলেন, কার্ত্তিক সহকারী শিক্ষকদের কু-প্রস্তাব দেয়া, মোবাইল চুরি, শিক্ষার্থীদের কাছে প্রশ্নপত্র বিক্রি, বিদ্যালয়ের মালামাল আত্মসাৎ, মানুষের কাছ থেকে কৌশলে টাকা হাতিয়ে নেয়া, নারীদের যৌন হয়রানিসহ নানা প্রকারের অপকর্মের সাথে জড়িত। কার্ত্তিক শিক্ষক নামের কলঙ্ক।
ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম মল্লিক বলেন, কার্ত্তিক মাষ্টারের বিরুদ্ধে সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে লিখিত অভিযোগ করেছিলাম। শিক্ষক হিসেবে মাষ্টার কার্ত্তিক খুব খারাপ লোক।
অভিযুক্ত শিক্ষক কার্ত্তিক চন্দ্র কির্ত্তনীয়া ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ঘটনা পুড়ানো হয়ে গেছে লিখে আর কি করবে সাংবাদিকরা।
সদর উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, মেয়েলি ঘটনার পর গত ৪ জুলাই থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ নং কীর্তিনগর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত ছিলেন কার্ত্তিক। পরে ১৭ জুলাই প্রধান শিক্ষক হিসেবে ৩৩ নং ছোট বিনোদপুর নদীরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চলতি দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। কার্ত্তিকের অপকর্মের লিখিত অভিযোগ জেলা শিক্ষা অফিসে জানিয়েছিলাম। এতো অপকর্মের পরেও পদোন্নতি এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পদোন্নতি উদ্ধর্তন কর্মকর্তারা দেন। এখানে আমাদের কিছু করার নাই।
এ ব্যাপারে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, শিক্ষক কার্ত্তিক চন্দ্র কির্ত্তনীয়ার বিরুদ্ধে আমার কাছে সরাসরি কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি। মৌখিক অভিযোগে কি ব্যবস্থা নেয়া যায়।


error: Content is protected !!