সোমবার, ১৫ই আগস্ট, ২০২২ ইং, ৩১শে শ্রাবণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১৬ই মুহাররম, ১৪৪৪ হিজরী
সোমবার, ১৫ই আগস্ট, ২০২২ ইং

শরীয়তপুরে জালিয়াত চক্রের দ্বারা জমির মালিক হয়রানির অভিযোগ!

শরীয়তপুরে জালিয়াত চক্রের দ্বারা জমির মালিক হয়রানির অভিযোগ!

শরীয়তপুর জেলা সদরে আউয়াল সুপার মার্কেট বিক্রির পরে একাধিক মালিকানা দাবী করছেন বলে চঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
এম এ আউয়াল এর মৃত্যু পরবর্তী তার ওয়ারিশগণ জালিয়াত চক্রের দ্বারা বিভিন্ন ভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ওয়ারিশগণ জানায়, এম এ আউয়ালের মালিকানা সম্পত্তিতে জাল দলিল, জাল স্ট্যাম্পে চুক্তিনামা সৃষ্টিসহ বিভিন্ন ভাবে হয়রানি করে আসছে একটি চক্র। মৃত এম এ আউয়ালের ওয়ারিশগণ জমি বিক্রি করেও সমাধান পাচ্ছেন না। ভূয়া ও জাল স্ট্যাম্প দেখিয়ে জমির বর্তমান মালিকদেরকেও জালিয়াত চক্রটি হয়রানি করে আসছে। জমির প্রকৃত মালিকগণ প্রশাসনের কাছে আইনী সহায়তা কামনা করছেন।
জমির সাবেক ও বর্তমান মালিক সূত্র জানায়, ৭৯ নং তুলাসার মৌজার বিআরএস ৩৯ নং খতিয়ানের ২৫৫৫, ২৫৫৬ ও ২৫৫৭ নং দাগের ৫০.৩৮ শতাংশ জমির মালিক মরহুম এম এ আউয়াল। এম এ আউয়ালের মৃত্যু পরবর্তী তার পুত্র রাকিবুল আহসান রাকিব জমি বিক্রয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করে। সেই মূহুর্তে সদর উপজেলার কোয়ারপুর গ্রামের মৃত আ. মজিদ সরদারের ছেলে সফিজদ্দিন সরদার গং জাল দলিল সৃষ্টি করে সহকারী জজ চিকন্দী আদালতে এম এ আউয়ালের পুত্র রাকিবুল আহসান রাবিক সহ ৪ জনকে বিবাদী করে দেওয়ানী মামলা দায়ের করে।
সফিজদ্দিন সরদারের মামলায় দেখানো হয় জমির আর.এস. রেকর্ডীয় মালিক সীতানাথ দেব বাকী করের দায় দেখিয়ে ১৯৬২ সনে মাদারীপুর মহুকমার অন্তর্গত পালং সার্টিফিকেট আদালত থেকে ১৩৭ নম্বর (পিএস) মামলা বলে সফিজদ্দিন সরদারগং নিলাম ক্রয় করেছেন। জালিয়াত চক্র কাঁচা ও অদক্ষ হাতে জালিয়াতি করায় সেখানে কিছু ত্রুটি রেখে যায়। ১৯৬২ সনে যে ডুপ্লিকেট কার্বণ রশিদে (ডিসিআর) নিলাম ক্রয় দেখিয়েছে সেই ৫৭১২৫ নম্বর ডিসিআর রশিদটি মুদ্রিত হয়েছে ১৯৭০ সনে। সেই ডিসিআর এর তারিখ দেখানো হয় ৫ জুলাই ১৯৬১ আর জেলা দেখানো হয় শরীয়তপুর। ১৯৭০ সনে মুদ্রিত ডিসিআর ফরমে ১৯৬১ সনে কিভাবে নিলাম ক্রয় সম্ভব। আর তখন শরীয়তপুর জেলার কোন অস্তিত্ব ছিল কি না? এ নিয়ে সুধী মহলে প্রশ্ন উঠেছে। এ থেকে জালিয়াত চক্রের শিক্ষা হওয়া উচিত। জালিয়াত চক্র সহকারী জজ আদালত চিকন্দীতে যে দেওয়ানি মামলা করে বিচারক ১১ অক্টোবর তারিখে তা খারিজ করেন। তখন জমি বিক্রিতে আর কোন আইনী বাঁধা ছিল না বলে জমির বর্তমান মালিকগণ তা ক্রয় করেন।
জমির মালিক মৃত এম এ আউয়াল এর পুত্র রাকিবুল আহসান রাকিব কন্যা ফাতেমাতুজ জোহরা, জান্নাতুল ফেরদৌস ও স্ত্রী আমেনা বেগমদের প্রস্তাব মতে শরীয়তপুর শহরের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী মাহবুব রশিদ রিপন, আলমগীর হোসেন বেপারী ও আ. মান্নান মোল্যা জমি ক্রয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে। জমির বর্তমান বাজার মূল্য অনুযায়ী বিক্রির সিদ্ধান্তে উপনিত হয়ে গত ২৩ অক্টোবর শরীয়তপুর সদর সাব রেজিস্টার অফিস থেকে সাব কবলা দলিল করেন। জমি ক্রয়ের সংবাদ পেয়ে আরোও একটি চক্রের আবির্ভাব হয়। তখন উত্তর বালুচরা গ্রামের আলী একাব্বর পাহাড়ের ছেলে আলী হোসেন পাহাড় পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে একটি অভিযোগ দায়ের করে। সেখানে বলা হয় জমির পূর্ববর্তী মালিক রাকিবুল আহসানের সাথে আলী হোসেন পাহাড়ের জমি বিক্রয় সংক্রান্ত চুক্তি ছিল। তখন আলী হোসেন পাহাড়ের কাছ থেকে এম এ আউয়ালের ছেলে রাকিবুল আহসান রাবিক ৩৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা অগ্রিম গ্রহন করেছে। অভিযোগের ভিত্তিতে পালং থানার এস আই মো. সায়েম সুজন মাহবুব রশিদ রিপন, আলমগীর হোসেন বেপারী ও আ. মান্নান মোল্যাদের নোটিশ করে ৭ নভেম্বর সকালে তার নিকট হাজির থাকতে অনুরোধ করেন। সেখানে দরখাস্তকারী তার মানিত সাক্ষি নিয়ে উপস্থিত হয়। উপস্থিত সভায় সহকারী পুলিশ সুপার (নড়িয়া সার্কেল) এর নিকট দরখাস্তকারী জমি ক্রয় বা লেনদেন সংক্রান্ত কোন প্রমান উপস্থাপন করতে পারে নাই।
আউয়াল সুপার মার্কেটে ভাড়াটিয়া ব্যবসায়ী হিমু ইলেকট্রনিক্সের মালিক মো. চঞ্চল মৃধা সাথে দোকান মালিকের চুক্তির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। সেখানেও ব্যবসায়ী চঞ্চল মৃধা প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে মালিক পক্ষ। তিনি ২০১৬ সনের ১ জানুয়ারী থেকে ২০১৮ সনের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চুক্তিতে আউয়াল সুপার মার্কেটের ৩ ও ৪ নম্বর দোকান ভাড়ায় নেয়। ১ লাখ টাকা অগ্রিম প্রদান করে মাসিক ৬ হাজার ৫০০ টাকা ভাড়া প্রদান করে আসছে। এখন মো. চঞ্চল মৃধা ৪ লাখ টাকা অগ্রিম প্রদান করেছে বলে দাবী করছে। তবে তার বক্তব্য সমর্থনে কোন প্রমানপত্র দেখাতে পারছে না।
এ বিষয়ে ব্যবসায়ী মো. চঞ্চল মৃধা বলেন, আমার সাথে মালিক পক্ষের দুইটি চুক্তিপত্র হয়েছে। প্রথম চুক্তিপত্রে ১ লাখ টাকা অগ্রিম দিয়ে প্রতিমাসে ৬ হাজার ৫০০ টাকা ভাড়া প্রদানের চুক্তি হয়। চুক্তির মেয়াদ ছিল ৩ বছর। আগামী ডিসেম্বরে আমার চুক্তি শেষ হবে। আমার প্রতিষ্ঠানের পাশবর্তী কসমেটিক দোকান ছেড়ে দিলে আমি সেটিও ভাড়ায় নেই। তখন আরও একটি চুক্তি হয়। সেই চুক্তিতে ৪ লাখ টাকা অগ্রিম প্রদান করেছি। তার মেয়াদ শেষ হতে আরও এক বছর বাকী। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে যারা জমি ক্রয় করেছে তারা এসে আমার কাছে ভাড়া চায়। আমি যে মালিকের সাথে চুক্তি করেছি সে এসে আমাকে সিদ্ধান্ত দিবে আমি কাকে ভাড়া দিব। সেও আসে না। এ বিষয়ে আমি শরীয়তপুর পৌর মেয়র রফিকুল ইসলাম কোতোয়ালের কাছে নালিশ করেছি। সে উভয় পক্ষকে নিয়ে বসে সিদ্ধান্ত দিবে। তাছাড়া এ এলাকায় আমি অকেনদিন ব্যবসা করি। এখানে আমার পরিচিতি আছে। ব্যবসায়ীক লেনদেন আছে। কেউ হঠাৎ করে দোকান ছাড়তে বললেও আমি দোকান ছাড়তে পাড়ি না। আমার সাথে বৈধ চুক্তিপত্র সাক্ষি প্রমাণ আছে। প্রয়োজনে আমি উচ্চ আদালতে যাব।
এ বিষয়ে জমির বর্তমান মালিক মো. আলমগীর হোসেন বেপারী ও মাহবুব রশিদ রিপন বলেন, জালিয়াত চক্রের দায়েরকৃত মামলায় জমির পূর্ববর্তী মালিকগণ গত ১১ অক্টোবর আদালত থেকে রায় পায়। তখন জমি ক্রয়-বিক্রয়ে আর বাঁধা না থাকায় বিক্রেতার প্রস্তাম মতে আমরা জমি ক্রয়ে রাজী হই। গত ২৩ অক্টোবর শরীয়তপুর সদর সাব রেজিস্টার অফিস থেকে জমির সাব কবলা করি। আলী হোসেন পাহাড়ের অভিযোগের ভিত্তিতে ১ নভেম্বর পালং থানার এসআই মো. সায়েম আমাদের নোটিশ করে জানায় ৭ নভেম্বর সাক্ষ্য-প্রমাণ ও কাগজপত্র সহ তার নিকট হাজির হতে। আমরা হাজির হলে এ এস পি নড়িয়া সার্কেলের কাছে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আমাদের নিয়ে যায়। সেখানে আমরা সাক্ষ্য-প্রমান ও কাগজপত্র উপস্থাপন করি। আবেদন কারী কোন প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। আমাদের ক্রয়কৃত দোকানের ভাড়াটিয়া ব্যবসায়ি চঞ্চল মৃধা দোকান ছাড়বে না বলে জানিয়েছে। দোকানের ভাড়াও দেয় না। তার সাথে ব্যবসায়ীক চুক্তি আগামী ৩১ ডিসেম্বর শেষ হবে। তাকে দোকান ঘর ছেড়ে দেয়ার জন্য বললে সে জানায় ৪ লাখ টাকা অগ্রিম দিয়েছে। টাকা না পেলে সে দোকান ছাড়কে না। অথচ দোকান ভাড়ার চুক্তিপত্রে লেখা আছে ১ লাখ টাকা অগ্রিম প্রদান করেছে। তার শরীরে এক বিন্দু রক্ত থকতে দোকান ছাড়বেনা মর্মে হুমকি দিয়ে আসছে চঞ্চল মৃধা। আমাদের অভিযোগের ভিত্তিতে শরীয়তপুর পৌর মেয়র রফিকুল ইসলাম কোতোয়াল ভাড়াটিয়া ব্যবসায়ী চঞ্চল মৃধা ও রূপক স্টুডিও মালিক আলী হোসেনকে নোটিশের মাধ্যমে ডাকে। মেয়রের ডাকে চঞ্চল ও আলী হোসেন সাড়া দেয়নি। মালিক পক্ষের সাথে ভাড়াটিয়া যদি এমন আচরণ করে তাহলে কোন মালিকই এ ধরনের ভাড়াটিয়ার সাথে দোকান ঘর ভাড়ায় চুক্তিবদ্ধ হবে না।
আলী হোসেন পাহাড় বলেন, আমি পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছিলাম। উভয় পক্ষের কাগজপত্র দেখে আমাকে আদালতের আশ্রয় গ্রহন করতে বলেছে। ন্যায় বিচারের জন্য আমি আদালতে যাব।
এ বিষয়ে পালং মডেল থানার এস আই মো. সায়েম সুজন বলেন, আমার কাছে আলী হোসেন পাহাড় নামে এক ব্যক্তির লিখিত অভিযোগ আসে। আমি নোটিশ করে উভয় পক্ষকে ডেকে সহকারী পুলিশ সুপারের (নড়িয়া সার্কেল) উপস্থিতিতে উভয় পক্ষের কাগজপত্র দেখি। যেহেতু বিষয়টি জমি সংক্রান্ত তাই উভয় পক্ষকে আদালতের স্মরনাপন্ন হতে বলেছি।


error: Content is protected !!