সোমবার, ১৫ই আগস্ট, ২০২২ ইং, ৩১শে শ্রাবণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১৭ই মুহাররম, ১৪৪৪ হিজরী
সোমবার, ১৫ই আগস্ট, ২০২২ ইং

শরীয়তপুর হানাদার মুক্ত দিবস আজ

শরীয়তপুর হানাদার মুক্ত দিবস আজ

আজ ১০ ডিসেম্বর শরীয়তপুর পাক হানাদার মুক্ত দিবস। আজ থেকে ৪৬ বছর আগে বাঙালি জাতি তাঁদের জাতিসত্তা অধিকারকে হানাদার পাকিস্তানিদের রক্তাক্ত হাত থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিল পূর্ব মাদারীপুর তথা আজকের শরীয়তপুরবাসী। কিন্তু না আজ ও বাঙালিরা ভূলতে পারেনি সেই বিভৎস্য, নারকীয় হত্যাকান্ড, পরিবারের স্বজনদের সামনে তাঁদের স্বজনদেরকে ধর্ষণ, নির্বিচারে গুলি বর্ষণ, নড়পশুরা দু’চোখ বন্ধ করে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়খার করে দিয়েছিল শরীয়তপুরের পালং থানার মধ্যপাড়া, উত্তর দক্ষিণ মধ্যাপাড়া, মালো পাড়া, ঝালো পাড়া, কাশাভোগ, নীলকান্দি, আংগারিয়া বাজার, ধানুকা, জেলা প্রশাসকের বর্তমান বাড়ি, কোটাপাড়া বাজার, নড়িয়া থানার গোলার বাজার, তেলিপাড়া, ভূমখাড়া বিঝারি এলাকা সমূহে পাক হানাদার এবং তাঁদের ভ্রুণে জন্ম নেয়া আলবদর, রাজাকার, আলসামসদের সহযোগিতায় এসব এলাকায় বিশেষ করে পালং থানার মধ্যপাড়া এবং এর আশ পাশের এলাকা সমূহে শত শত নারী তাঁদের সবচাইতে মূল্যবান ইজ্জৎ সম্ভ্রম হারিয়েছেন। পালং থানাটি ছিলো রাজাকারের ঘাটি। মানবতা বিরোধী আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যূনাল সংস্থার দন্ডাদেশ শরীয়তপুরের দুই রাজাকারের ফাঁসিকাষ্ঠে দন্ডাদেশ জানতে পেরেই পালং থানার পিস কমিটির সভাপতি কুখ্যাত রাজাকার সোলায়মান মোল্লা জেলখানায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার মুহুর্তে তিনি বলেন, পাকিস্তান জিন্দাবাদ। রাজাকার সোলায়মান মোল্লার দক্ষিণহস্ত রাজাকার গাজী ইদ্রিস আলী সরদার আগে থেকেই পলাতক ছিলেন। এই দুই জনের নেতৃত্বে পূর্ব মাদারীপুর বর্তমান শরীয়তপুর সদর পালং থানার মধ্যপাড়া এলাকার কম করে দুই শতাধিক নারী পুরুষকে অস্ত্রের মুখে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় মাদারীপুর এ আর হাওলাদার জুট মিলে। সেখানে যুবতী/বিবাহিত/অবিবাহিত নারীদেরকে ধর্ষণ, শেষে শারীরিক নির্যাতন করে অবশেষে জুট মিলের পেছন দিয়ে আড়িয়াল খা নদীতে ফেলে দেয়া হয়। পুরুষদেরকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ সমর্থণ করার অভিযোগে তাঁদেরকে গুলি করে বেওনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়। কিছু বয়স্ক মহিলা হাতে পায়ে ধরে জীবন বাঁচিয়ে পায়ে হেটে এলাকায় ফিরে স্বজনদের কাউকে কাউকে খুঁজে পেলে ও মাথাগোজার ঠাই, আত্মীয় স্বজনকে পেয়েছেন মৃত অথবা জীবন বাঁচাতে পলাতক অবস্থায়। গ্রামের পর গ্রাম পেয়েছেন তামামাটি। সুদীর্ঘ ২০ বছর ধরে তাদের সাথে কথা বলে খোঁজ নিয়ে যে তথ্যাদি সংগ্রহ করে ২০১০ সালের মে মাসে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যূনালে। সে মামলায় ২০১৬ সালের ৫ ডিসেম্বর পালং থানার কুখ্যাত রাজাকার, থানা পিস কমিটির সভাপতি মৌলবী সোলায়মান মোল্লা এবং অপর রাজাকার ১৯৭৯ সালের ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সাথে এক সংঘর্ষে মৌলবী ইদ্রিস আলী সরদার ছাত্রসংঘের নেতা হিসেবে এবং যুদ্ধে বিশাল ভূমিকা রাখায় তৎকালীন গোলাম আযমরা তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গাজী উপাধী দিয়ে সন্মানীত করেন।
তাইতো আজ ও সেই ভয়ার্ত ক্ষণ,৭১’ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাক হানাদার এবং দোসর রাজাকার, আলসামস, আলবদরদের নির্মম নিষ্ঠুর বর্বরতার বর্ণনা দিতে গিয়ে অঝোরে কেঁদে কেঁদে অজ্ঞান হয়ে পড়লেন কয়েকজন বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা। তারা গুমড়ে গুমড়ে কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, আমার সন্তানটি, আমার অপ্রাপ্ত বয়স্ক কন্যাটি, আমার স্বামী, আমার দেবর, আমার শশুর, আমার আদরের দুলাল বিশ্বনাথ, আমার অবিবাহিতা স্মৃতি রানী আর ফিরে আসবে কি ? আমাদের এলাকায় আশ্রয় নিতে আসা বরিশাল, ভোলা, ঝালকাঠি, গৌরনদী, কালকিনি, রাজৈর থেকে জীবন বাঁচাতে আসা আত্মীয়রা ফিরে আসবে তো ? যারা গুলি খেয়ে ও বেঁচে ছিলো তারা কেউ চা বিক্রেতা, কেউ বিড়ি ফ্যাক্টরী মালিক ছিলো তারাও তো মারা গেলো, কেউতো খবর নেয়নি।
এ সময় মধ্যপাড়া এলাকায় এবং এর আশ পাশে পাক হানাদার এবং তাদের দোসর রাজাকার আলবদর আলসামসরা নিষ্ঠুর নির্মমভাবে গুলি করে, ধর্ষণ করে অগ্নিসংযোগ করে মাইলের পর মাইল এলাকাকে তামা মাটি করেছে। শিশু, নারী, পুরুষ সবমিলে ৩৭৪ জনকে হত্যা করেছে। এর মধ্যে একজন মাত্র মুসলমান, কৃষক আব্দুছ ছামাদ সিকদার, বাকীরা সকলেই হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। এ পর্যন্ত মধ্যপাড়ায় বধ্যভূমি থেকে কোন রকম একটি স্মৃতিসৌধ হয়েছে। তাতে মাত্র ৮১ জনের নাম উঠে এসেছে যারা এলাকার মানুষ। কিন্তু অসংখ্যক হিন্দুরা বৃহত্তর বরিশাল, কালকিনি, মাদারীপুর, রাজৈর থেকে এখানে আশ্রয় গ্রহণের জন্য এসে হত্যা খুন ধর্ষণের শিকার হয়েছে কে দেবে তার হিসেব।
ভেদরগঞ্জ এলাকায় প্রায় জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে প্রায় ২ শতাধিক পাক হানাদার ও তাদের সহযোগি রাজাকারদের সাথে মুক্তিবাহিনীর এক সম্মুখ সমরে ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। তাদের গ্রুপ কমান্ডার ছিলেন, আক্কাছ মিয়া। ভেদরগঞ্জের মহিষারে মুক্তিযোদ্ধাদের গণকবরে ঘুমিয়ে আছেন আক্কাস বাহিনীর ১১ বীর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা।
এ দিকে পালং থানা অপারেশনে শহীদ হন বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের এবং আঃ মান্নান। পালং থানায় সর্ব প্রথম ব্যাজ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে থানায় প্রবেশ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব হোসেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ হোসেন অবঃ এ টি ও সহ তাদের সাথীরা। পালং থানা অপারেশনে অসংখ্য পাক বাহিনী এবং কুখ্যাত রাজাকার মারা যায়। এই ভয়াবহ থানা অপারেশনে নেতৃত্ব দেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মাস্টার ইদ্রিস আলী এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাসেম মৃধা।
এ সময় অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা তাঁদের সাথে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব হোসেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ হোসেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা সুলতান মাহমুদ (সীমন) বীর মুক্তিযোদ্ধা আলাউদ্দিন হাওলাদার, বীর মুক্তিযোদ্ধা সুলতান মাঝি, বীর মুক্তিযোদ্ধা মীর ইউনুস আলী, বীর মুক্তিযোদ্ধা গিয়াস উদ্দিন খলিফা, বীর মুক্তিযোদ্ধা ওমর আলী খলিফাসহ জেলার এবং জেলার বাইরের অসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা পালং থানা শক্রমুক্ত করার যুদ্ধে অংশ নেয়। পালং থানা মুক্ত করার সময়ে বি এল এফ (বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স) মুজিব বাহিনীর নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা মাষ্টার আবুুল ফজল, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার খান, বীর মুক্তিযোদ্ধা আঃ জলিল হাওলাদার, হযরত আলী তস্তার, আব্দুল আজিজ সিকদার ও বিশাল ভূমিকা রাখেন।
ডামুড্যায় দামুদর নদীতে একটি লঞ্চে করে পাক হানাদাররা এসে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলা চালালে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে শক্তি সঞ্চয় করে পাল্টা হামলা চালালে পাক হানাদাররা পানিতে ডুবে পরপারে চলে যায়। ডামুড্যা, ভেদরগঞ্জ, গোসাইরহাট থানায় মুক্তিযুদ্ধকালীন কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আঃ মান্নান রাঢ়ী, ইকবাল হোসেন বাচ্চু, নেতৃত্ব দেন। যুদ্ধকালীন কমান্ডার হিসেবে তাঁদের গুরুত্ব অনেক বেশী এতে সন্দেহ নেই।
নড়িয়া থানার মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা মন্টু, বীর মুক্তিযোদ্ধা মিতালী, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী, বীর মুক্তিযোদ্ধা হাসান আলী মাষ্টার প্রমূখ।
উল্লেখ্য নড়িয়া থানায় সবচাইতে বেশী মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন, এটার মূল কারণ হলো আমাদের সাবেক এম পি, সাবেক ডেপুটি স্পীকার দি দেন ক্যাপ্টেন শওকত আলী তখন সাব সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্বে ছিলেন মাদারীপুরও পুর্ব মাদারীপুর জোন। সেই সুবাদে নড়িয়ার থানার বেশী সংখ্যক যুবকরা সে সময়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছিল।
৭১‘ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মে’ মাসের ২২ তারিখ মাদারীপুর থেকে আসা পাক হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসর রাজাকাররা আজও শরীয়তপুরের মতো জায়গায় পাক বাহিনী চলে গেলেও তাদের দোসররা জামাত/শিবিরের ছদ্মবেশে গোপন বৈঠক চালিয়ে যাচ্ছে, এরা কচ্ছপ গতিতে এগুচ্ছে। আর তাঁদেরকে যারা পূণর্বাসিত করেছেন সেই ন্যাশনালিষ্টরা এগুচ্ছিলেন খরগোস গতিতে, তাই আজ স্বাধীনতা বিরোধীরা বুক ফুলিয়ে হাটছে, ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বাধীনতাবিরোধী খালেদা জিয়া জামাত শিবির তথা তৎকালীন মুসলিম লীগারদেরকে নিয়ে সরকার গঠন করে আমাদের সর্বোচ্চ অহংকার মুক্তিযুদ্ধকে কলংকিত করেছে। ঐ পাঁচ বছরে বেগম খালেদা জিয়া সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে কম পক্ষে লক্ষাধিক কর্মকর্তা/কর্মচারি নিয়োগ দিয়েছিলেন সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে বা সেক্টরে। যারা সরাসরি জামাত/শিবির সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ভূক্তভোগীরা বলেন, আমরা আর সেই অবস্থায় ফিরে যেতে চাই না। ভূক্তভোগীরা ভয়ার্তকন্ঠে বলেন, ভারতে গেলে আমাদের জায়গা নেই, জন্মসূত্রে আমরা বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করা হিন্দু সম্প্রদায় আমাদের জীবনের নিশ্চয়তা কে দেবে। কে আমাদের মাথা গোজার ঠাই দেবে কোথায় যাবো আমরা? শেখ হাসিনার সময়টা না হয় ভাল কাটলো, কিন্তু যদি অগত্যা কখনো স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি ক্ষমতায় এসে যায়, তা হলে তো আবার ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, গুলি, বেয়নেট চার্জ, আগুন সন্ত্রাসের কবলে পড়তে হতে পারে তখনকি আপনারা আমাদেরকে জীবনের, বসবাসের নাগরিকত্ত্বের নিশ্চয়তা দিতে পারবেন? কারণ আমরা এদেশে সংখ্যালঘু, ভারতে মুসলমানরা সংখ্যালঘু দেখাতে পারবেন ভারত থেকে কোনো মুসলমানকে পালিয়ে বাংলাদেশে আসতে হয়েছে? পারবেন না বেশী কথা বলতে চাইনা যান, অনেক হয়েছে। আমরা ও চাই শেখ হাসিনা আবার ক্ষমতায় আসুক আমরা স্বাধীন দেশে ডাল ভাত খেয়ে, মোটা কাপড় পড়ে কোনো রকমে বেঁচে থাকি।


error: Content is protected !!