প্রযুক্তির বৈপ্লবিক অগ্রগতির এই যুগে স্মার্টফোন মানুষের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। দ্রুততম যোগাযোগ, তথ্যের অবাধ প্রবাহ আর হাতের মুঠোয় বিনোদনের সুযোগ তৈরি করে দিয়ে এটি আমাদের জীবনযাত্রাকে নিঃসন্দেহে সহজ করেছে। তবে সুবিধার এই ঝলমলে মুদ্রার অপর পিঠে জমে উঠেছে এক গভীর সামাজিক ও পারিবারিক বিপর্যয়। যে প্রযুক্তি আমাদের দূরকে কাছে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা-ই আজ ঘরের ভেতরের মানুষগুলোকে পরস্পর থেকে যোজন যোজন দূরে ঠেলে দিচ্ছে। স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে আমাদের চিরচেনা পারিবারিক সম্প্রীতির মায়ার বাঁধন আজ শিথিল হয়ে পড়েছে।

একই ছাদের নিচে বসবাস, একই টেবিলে বসে রাতের খাবার কিংবা একই ঘরে অবস্থান—দৃশ্যত পরিজনদের কাছাকাছি থাকলেও মনস্তাত্ত্বিকভাবে সবাই যেন আলাদা এক নির্জন দ্বীপে বাস করছেন। রক্ত-মাংসের মানুষের উপস্থিতি উপেক্ষা করে ডিজিটাল স্ক্রিনের নীল আলোয় বুঁদ হয়ে থাকার এই সামাজিক ব্যধি এখন প্রায় প্রতিটি ঘরেই দৃশ্যমান।
সম্প্রতি রাজধানীর বেশ কিছু পরিবারের ওপর চালানো অনানুষ্ঠানিক পর্যবেক্ষণ ও সমাজবিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক সমীক্ষায় এক বিষাদময় চিত্র উঠে এসেছে। আমাদের পরিবারগুলোতে একসময় যে প্রাণবন্ত আড্ডা, যৌথ হাসিমুখ কিংবা দিনশেষের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করার সংস্কৃতি ছিল, তা প্রায় বিলুপ্তির পথে। কর্মক্ষেত্র থেকে ফিরে বাবা-মা মগ্ন হচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভার্চুয়াল জগতে, আর অন্যদিকে সন্তানরা হারিয়ে যাচ্ছে অনলাইন গেমস কিংবা ভিডিও স্ট্রিমিংয়ের মায়াজালে। এর ফলে গড়ে উঠছে এক অদৃশ্য ও অদ্ভুত মানসিক দূরত্ব, যা দিনশেষে রূপ নিচ্ছে পারিবারিক কলহ, নিসঙ্গতা, মানসিক অবসাদ ও দাম্পত্য ভুল বোঝাবুঝিতে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের গবেষকদের মতে, প্রযুক্তির এই অনিয়ন্ত্রিত অতি-ব্যবহার আমাদের ঐতিহ্যবাহী সমাজ ও পরিবার কাঠামোকে ক্রমান্বয়ে যান্ত্রিক করে তুলছে। মানুষ এখন বাস্তব জীবনের জীবন্ত ও উষ্ণ সম্পর্কের চেয়ে স্ক্রিনের কৃত্রিম ও ছায়া-জগৎকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। এর কুফল হচ্ছে মারাত্মক—শিশুদের স্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক ও আবেগীয় বিকাশ গভীরভাবে ব্যাহত হচ্ছে, আর প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে একা বোধ করার প্রবণতা ও পারস্পরিক দূরত্ব।
প্রযুক্তির এই আগ্রাসন থেকে মুক্ত হয়ে পারিবারিক বন্ধন ও হারানো সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনতে সমাজবিজ্ঞানী ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি তাৎপর্যপূর্ণ ও বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন:
‘নো-ফোন জোন’ গড়ে তোলা: বাড়ির নির্দিষ্ট কিছু স্থান, বিশেষ করে খাবারের টেবিল এবং শোবার ঘরকে কঠোরভাবে ‘স্মার্টফোন মুক্ত এলাকা’ ঘোষণা করা জরুরি। পরিবারের সবার সাথে খাওয়ার সময় কিংবা ঘুমানোর অন্তত আধ ঘণ্টা আগে মোবাইল ফোন দূরে রাখার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
নিয়মিত ‘ডিজিটাল ফাস্টিং’ এর অভ্যাস: দৈনিক বা সাপ্তাহিকভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট সময় (যেমন—প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৮টা) পরিবারের সবাই মিলে ফোন বন্ধ বা সাইলেন্ট করে রাখার নিয়ম তৈরি করা যায়। এই সময়টুকু শুধুই নিজেদের ভেতরের খোলামেলা গল্প, পরামর্শ ও পারস্পরিক কুশল বিনিময়ের জন্য বরাদ্দ থাকবে।
যৌথ বিনোদন ও পারিবারিক খেলাধুলা: অবসরে একা একা ডিভাইসে মগ্ন না থেকে পরিবারের সবাই মিলে লুডু, ক্যারাম, দাবা কিংবা একসাথে বসে বই পড়া ও গান শোনার যৌথ সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবিত করা প্রয়োজন।
গুণগত সময় ও প্রকৃতির সান্নিধ্য: ছুটির দিনগুলোতে যান্ত্রিক শহরের সীমানা পেরিয়ে পরিবারের সকলকে নিয়ে প্রকৃতির কাছাকাছি ঘুরে আসা উচিত। এটি মানসিক অবসাদ দূর করার পাশাপাশি সম্পর্কের নমনীয়তা ও সহমর্মিতা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখে।
আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্ক্রিন টাইম ট্র্যাকার: স্মার্টফোনে থাকা ‘Digital Wellbeing’ বা ‘Screen Time’ ফিচারের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়া ও বিভিন্ন অ্যাপের ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
স্মার্টফোন অবশ্যই আমাদের আধুনিক জীবনের এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ, কিন্তু তা যেন কোনোভাবেই আমাদের হৃদয়ের বন্ধন ও রক্ত-মাংসের নিবিড় সম্পর্কগুলোর চেয়ে বড় হয়ে না ওঠে। প্রযুক্তি মানবসেবার জন্য আবিষ্কৃত হয়েছে; প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণে মানুষ বন্দি হওয়ার জন্য নয়। প্রযুক্তিকে সঠিক সীমানায় রেখে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং পরিবারকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়াই হোক আজকের সামাজিক অঙ্গীকার—তবেই রক্ষ পাবে আমাদের হাজার বছরের আবহমান পারিবারিক সম্প্রীতি।
লেখক:
ট্রেড ইন্সট্রাক্টর, কনেশ্বর এস. সি. এডওয়ার্ড ইনস্টিটিউশন
ডামুড্যা, শরীয়তপুর।

মন্তব্য করুন