প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই চোখে পড়ে দুর্ঘটনার সংবাদ। কোথাও ট্রাক, কোথাও বাস, কোথাও মোটরসাইকেল—প্রতিটি গল্পেই লাশ, রক্ত, কান্না।
এ যেন আমাদের জীবনের প্রতিদিনের অংশ হয়ে গেছে।
দুঃখজনকভাবে, আমরা এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছি সড়কে মৃত্যুর সঙ্গে।
সম্প্রতি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার রাজনগর জামতলায় একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন এনজিও কর্মকর্তা মুন্নু রহমান।
তিনি মাগুরা থেকে রওনা হয়েছিলেন কর্মস্থল ডামুড্যার উদ্দেশ্যে।
কিন্তু কর্মস্থলে পৌঁছানোর আগেই জীবনের যাত্রা শেষ হলো মহাসড়কের ধুলায়।
একটি বেপরোয়া মিনি ট্রাক, এক মুহূর্তের অবহেলা—
এবং নিভে গেল এক জীবন, এক পরিবার, এক স্বপ্ন।
মুন্নু রহমানের গল্পটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
এটি বাংলাদেশের প্রতিটি জেলার, প্রতিটি সড়কের গল্প।
প্রতিটি পরিবারে আজ এক বা একাধিক সদস্য সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন। তবুও রাস্তাঘাটে শৃঙ্খলা ফেরেনি।
তবুও বেপরোয়া গতি, প্রতিযোগিতামূলক চালনা,
এবং অবহেলা আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা।
মৃত্যু এখন নিত্যসঙ্গী: বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়।
সরকারি পরিসংখ্যান যাই বলুক, বাস্তবে সংখ্যা আরও বেশি।
প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি মুখ, একটি গল্প, একটি ভাঙা পরিবার।
তবুও আমরা যেন সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলেছি।
আজ কেউ মারা গেলে, আমরা দুঃখ প্রকাশ করি,
সামাজিক মাধ্যমে কিছু পোস্ট দিই, তারপর ভুলে যাই।
কিন্তু যে মা তার ছেলেকে হারায়,
যে সন্তান তার বাবাকে হারায়—
তাদের শোকের কোনো শেষ নেই।
সড়ক দুর্ঘটনা এখন কেবল পরিসংখ্যান নয়,
এটি একটি সামাজিক রোগে পরিণত হয়েছে।
যার চিকিৎসা নেই, নেই প্রতিকার।
দায় কার? প্রশ্নটি আজ নতুন নয়—এই মৃত্যুর দায় কার?
চালক? যানবাহন মালিক? সড়ক বিভাগ? নাকি আমাদের সবাই?
চালকরা অনেক সময় ক্লান্ত, প্রশিক্ষণহীন, কিংবা অবহেলাপূর্ণ।
বেশিরভাগ ট্রাকচালক রাতভর ড্রাইভ করে,
যথেষ্ট বিশ্রাম ছাড়া আবার পথে নামে।
তাদের অনেকেরই বৈধ লাইসেন্স নেই,
আরো ভয়ঙ্কর—অনেকে মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালায়।
অন্যদিকে সড়কের অবস্থা করুণ।
গর্ত, খানাখন্দ, সাইনবোর্ডের অভাব,
রাস্তার পাশে অবৈধ পার্কিং—সব মিলে এক প্রাণঘাতী ফাঁদ।
পুলিশ ও প্রশাসনেরও গাফিলতি আছে।
চেকপোস্টে নিয়ম মানার চেয়ে
ঘুষ বা রাজনৈতিক প্রভাবই বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায় অনেক সময়।
সবশেষে আমাদের নাগরিক দায়িত্বহীনতা—
আমরা নিজেও ট্রাফিক আইন মানি না,
হেলমেট পরি না, ওভারটেক করি,
আর শেষে দোষ দিই শুধু চালককে।
এই সম্মিলিত দায়বোধের অনুপস্থিতিই
আজ মৃত্যুকে এত সহজ করে তুলেছে।
আইন আছে, প্রয়োগ নেই:
বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা আইন আছে।
‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ অনুযায়ী
অবহেলাজনিত দুর্ঘটনায় কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে এ আইন খুব কমই প্রয়োগ হয়।
দুর্ঘটনার পর মামলা হয়, চালক ধরা পড়ে, কিছুদিন জেল খাটে, তারপর জামিনে বেরিয়ে আসে।
ভুক্তভোগীর পরিবার ক্ষতিপূরণ তো দূরের কথা,
ন্যায়বিচারও পায় না।
আইনের শাসন যখন দুর্বল হয়,
মানুষের জীবন তখন তুচ্ছ হয়ে যায়।
তাই শুধু আইন থাকলেই হবে না,
তার কঠোর বাস্তবায়নই পারে মৃত্যুর মিছিল থামাতে।
সড়কের বেহাল দশা:
শরীয়তপুর-ঢাকা মহাসড়ক, পদ্মা সেতুর সংযোগ পথ
সবখানেই এখন চলছে ভারী যানবাহনের চাপ।
কিন্তু সড়কের মান সেই চাপ সহনীয় নয়।
নড়িয়া, জাজিরা, ডামুড্যা—প্রায় প্রতিটি সড়কেই খানাখন্দে ভরা।
বৃষ্টিতে পানি জমে যায়, চিহ্নিত লেন মুছে যায়, রাতের বেলায় দৃশ্যমানতা থাকে না।
এই অবস্থায় দুর্ঘটনা না ঘটাই আশ্চর্যের বিষয়।
এলাকাবাসীর বক্তব্যও তাই—
গত এক বছরে একই স্থানে সাতজন নিহত হয়েছেন।
তবুও উন্নয়ন প্রকল্পের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
সচেতনতার অভাব:
আমরা সচেতন হচ্ছি না। স্কুলে, কলেজে, মিডিয়ায়—
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতামূলক শিক্ষা প্রায় নেই বললেই চলে।
হেলমেট পরাকে এখনো অনেকেই “বিরক্তিকর” মনে করে।
সিগন্যাল অমান্য করা যেন বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।
এই মনোভাব না বদলালে, উন্নত সড়কও আমাদের রক্ষা করতে পারবে না।
মুন্নুর মৃত্যু আমাদের চোখ খুলুক। মুন্নু রহমানের মতো তরুণ কর্মকর্তা ছিলেন সমাজের জন্য আশীর্বাদ।
তিনি মানুষের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন,
গ্রামীণ উন্নয়নের স্বপ্ন দেখতেন।
আজ সেই স্বপ্ন ধুলোয় মিশে গেল।
কিন্তু তাঁর মৃত্যু যদি আমাদের চোখ খুলে দেয়,
তাহলেই এই মৃত্যু অর্থবহ হবে।
আমরা চাই, প্রশাসন ঘটনাটির যথাযথ তদন্ত করুক,
দোষীদের আইনের আওতায় আনুক।
সড়ক সংস্কার ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায়
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হোক।
আমাদের এখনই পরিবর্তন দরকার।
চালকদের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
প্রতিটি সড়কে স্পিড লিমিট ও ক্যামেরা মনিটরিং চালু করা দরকার।
অবৈধ যানবাহন বন্ধ করতে হবে।
সড়কের পাশে বিশ্রাম কেন্দ্র ও জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
আর সর্বোপরি—আইন প্রয়োগে জিরো টলারেন্স নীতি নিতে হবে।
সরকার, প্রশাসন, পরিবহন মালিক ও সাধারণ মানুষ—
সবাইকে মিলে কাজ করতে হবে।
কারণ সড়ক শুধু চলার পথ নয়, এটি জীবনের পথও।
একটি রাষ্ট্র তখনই মানবিক হয়,
যখন মানুষের জীবনকে সে মূল্য দেয়।
আমরা চাই না আর কোনো মুন্নু রহমান সড়কে মরুক।
আমরা চাই না আর কোনো মা তার ছেলেকে হারাক।
সড়ক দুর্ঘটনা কোনো ভাগ্য নয়,
এটি আমাদের ব্যর্থতার প্রতিফলন।
এই ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠতে হবে এখনই—
দায়িত্ব, শৃঙ্খলা আর মানবিকতার সমন্বয়ে।
যেদিন প্রতিটি চালক নিজের জীবন ও অন্যের জীবনকে সমান মূল্য দেবে, সেদিনই থামবে এই মৃত্যু মিছিল। শহীদুল ইসলাম পাইলট, সম্পাদক ও কলামিস্ট।

মন্তব্য করুন