বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক ও কৃষিনির্ভর দেশ। কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ দেশ আজ বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর একটি। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, অতিবৃষ্টি কিংবা অস্বাভাবিক খরায় প্রায় প্রতিবছর হাজারো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি দ্রুত নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও জনসংখ্যার চাপ পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এ প্রেক্ষাপটে বৃক্ষরোপণ কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের অংশ।


এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেই শরীয়তপুর জেলা পরিষদ গ্রহণ করেছে “বনজ, ফলদ ও ঔষধি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি-২০২৫”। জেলা পরিষদের উদ্যোগে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক মিজ তাহসিনা বেগম।

বৃহস্পতিবার সকালে দেওভোগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে শান্তির প্রতীক পায়রা উড়িয়ে এবং আটং-বুড়িরহাট সড়কে বৃক্ষরোপণের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে কর্মসূচিটি।

দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রতিফলন

জাতীয় পর্যায়ে আমরা প্রায়ই পরিবেশ রক্ষার নানা প্রতিশ্রুতি শুনি। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে এর বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ। শরীয়তপুর জেলা পরিষদ ও প্রশাসনের এই উদ্যোগ দেখিয়েছে—দূরদর্শী নেতৃত্ব থাকলে পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন বাস্তবায়ন সম্ভব। জেলা প্রশাসক মিজ তাহসিনা বেগম শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেই থেমে থাকেননি; বরং তিনি নিজ হাতে গাছ লাগিয়ে মানুষকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। তার সক্রিয় উপস্থিতি প্রমাণ করেছে, প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের দায়িত্বশীলতা একটি কর্মসূচিকে কতটা প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে।

অন্যদিকে জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলামের সমন্বিত প্রচেষ্টা এ কর্মসূচিকে দিয়েছে দৃঢ় ভিত্তি। প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের একসঙ্গে কাজ করার এ ধারা যদি অব্যাহত থাকে, তবে শরীয়তপুর হবে অন্য জেলার জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত।

কর্মসূচির তাৎপর্য

এই কর্মসূচির আওতায় শরীয়তপুরে তিন লাখ বনজ, ফলদ ও ঔষধি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যদিও এ বছর প্রথম ধাপে রোপণ করা হবে ২৫ হাজার গাছ, এটি নিঃসন্দেহে বড় একটি সূচনা।

বনজ বৃক্ষ কাঠের চাহিদা মেটাবে, যা অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে।

ফলদ বৃক্ষ পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ঔষধি বৃক্ষ বিকল্প চিকিৎসা ও ভেষজ শিল্পে সম্ভাবনা তৈরি করবে।

শুধু তাই নয়, এ গাছগুলো পরিবেশে কার্বন শোষণ বাড়াবে, যা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়ক হবে।

সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুফল

এই কর্মসূচি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। গাছ থেকে প্রাপ্ত ফল ও কাঠ স্থানীয় মানুষের আয় বাড়াবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বৃক্ষরোপণ শিক্ষার্থীদের প্রকৃতিপ্রেমী করে তুলবে। সড়কের দু’পাশে গাছ লাগালে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা কমবে, পরিবেশ হবে শীতল ও মনোরম। গ্রামীণ জনপদে সবুজের বিস্তার মানসিক প্রশান্তিও বয়ে আনবে।

চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা

তবে এ উদ্যোগ সফল করতে হলে কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা জরুরি। অতীতে অনেকবার দেখা গেছে, চারা লাগানো হলেও পরিচর্যার অভাবে তা টিকে থাকেনি। তাই এবার শুধু গাছ লাগানো নয়, বরং পরিচর্যা, সুরক্ষা ও টিকিয়ে রাখার ওপর জোর দিতে হবে। প্রতিটি চারার দায়িত্ব স্থানীয় প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে দিতে হবে। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করা গেলে তারা গাছের দেখভালকে দায়িত্ব মনে করবে।

এছাড়া কর্মসূচিকে একবারের ইভেন্টে সীমাবদ্ধ না রেখে ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যেতে হবে। পর্যায়ক্রমে তিন লাখ গাছ লাগানোর যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তার ধারাবাহিক বাস্তবায়নই হবে প্রকৃত সফলতা।

ভবিষ্যৎ করণীয়

১. প্রতিটি গাছের জন্য দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করা।
২. স্থানীয় জনগণ, সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করা।
৩. শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি চালু করা।
৪. জেলা পরিষদের মাধ্যমে নিয়মিত তদারকি ও প্রতিবেদন ব্যবস্থা করা।
৫. দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে জেলার প্রতিটি ইউনিয়নে কর্মসূচি সম্প্রসারণ।

উপসংহার

শরীয়তপুর জেলা পরিষদ ও জেলা প্রশাসনের এ দূরদর্শী উদ্যোগ নিঃসন্দেহে জাতীয় পর্যায়ে প্রশংসার দাবিদার। এটি কেবল একটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নয়; বরং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ, নিরাপদ ও টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের অঙ্গীকার। স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব, পরিকল্পনা ও অংশগ্রহণ থাকলে কীভাবে পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া যায়, শরীয়তপুর তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় যদি এমন উদ্যোগ গ্রহণ করা যায়, তবে একদিন আমাদের দেশ সত্যিই পরিণত হবে একটি সবুজ ও জলবায়ু সহনশীল বাংলাদেশে।

✍️ লেখক: শহীদুল ইসলাম পাইলট
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলাম লেখক। সম্পাদক, দৈনিক রুদ্রবার্তা। তারিখ: ৫/০৯/২০২৫ ইং

Facebook Comments Box