দেশের উচ্চ আয়ের পেশাজীবীদের তালিকায় চিকিৎসকরা শীর্ষে থাকলেও কর প্রদানের ক্ষেত্রে তারা পিছিয়ে। অর্থবছর ২০২৩–২৪–এর আয়ের বিবরণ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিপুল সংখ্যক চিকিৎসক কোটি কোটি টাকা আয় করলেও রাষ্ট্রের কাছে তাদের কর অবদান তুলনামূলকভাবে সামান্য।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রাইভেট প্র্যাকটিস, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মিলিয়ে প্রায় ৪০ হাজার নিবন্ধিত চিকিৎসকের মধ্যে মাত্র ৩,২০০ জন নিয়মিত কর দাখিল করেন। এর মধ্যে মাত্র ৬৫ জনের কর প্রদান ১০ লাখ টাকার বেশি।
কর প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, অধিকাংশ চিকিৎসকই ব্যাংক লেনদেন গোপন রেখে নগদ অর্থে ফি গ্রহণ করেন, ফলে প্রকৃত আয় নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে। একইসঙ্গে হাসপাতাল বা চেম্বারের নামে আলাদা ট্যাক্স ফাইল খোলা হলেও সেটিতে আয় কম দেখানোর প্রবণতা রয়েছে।
একজন সিনিয়র কর কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“চিকিৎসকদের অনেকেই উচ্চ জীবনযাপন করেন—বিলাসবহুল গাড়ি, একাধিক ফ্ল্যাট, বিদেশে সন্তানদের পড়াশোনা—কিন্তু আয়কর রিটার্নে দেখান মাসে ৫০ হাজার টাকার কম আয়। এটাই বাস্তবতা।”
অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিক্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমপিএ) দাবি করেছে, কর কাঠামো চিকিৎসকদের জন্য “অযৌক্তিক ও জটিল”, যার ফলে অনেকেই নিরুৎসাহিত হন। সংগঠনের মহাসচিব বলেন,
“আমরা কর ফাঁকির পক্ষে নই, কিন্তু এনবিআরের পদ্ধতি সহজ না হলে চিকিৎসকরা নিয়মিত কর ফাইল দিতে উৎসাহী হবেন না।”
তবে রাজস্ব বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ যুক্তি টিকছে না। ট্যাক্স পলিসি বিশ্লেষক মো. রাশেদুল ইসলাম বলেন,
“বিভিন্ন পেশায় কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক হলেও চিকিৎসকরা তুলনামূলকভাবে ছাড়পত্র পান। অথচ তারা দেশের অন্যতম উচ্চ আয়ের পেশাজীবী।”
এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ অর্থবছরে দেশের সার্বিক কর আদায়ে স্বাস্থ্যসেবা খাতের অবদান মোট কর রাজস্বের মাত্র ১.২ শতাংশ। অথচ বেসরকারি চিকিৎসা খাতের বার্ষিক লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
রাজস্ব প্রশাসন বলছে, আসন্ন অর্থবছর থেকে চিকিৎসকদের কর নেট বাড়াতে বিশেষ অভিযান চালানো হবে। ইতিমধ্যে রাজধানী ও বিভাগীয় শহরগুলোতে বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের আয়-ব্যয়ের তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে।
কর প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান,
“আমরা চেম্বারভিত্তিক ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দিয়েছি। এতে রোগীর প্রদত্ত ফি সরাসরি ব্যাংক লেনদেনের আওতায় এলে আয় লুকানো কঠিন হবে।”
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এই খাত থেকে প্রকৃত কর আদায় নিশ্চিত করা গেলে বছরে অতিরিক্ত ২,০০০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় সম্ভব।
অর্থনীতি বিশ্লেষক ড. ফারহানা রহমান বলেন,
“ডাক্তাররা সমাজের সেবক—তাদের থেকে দেশও সেবা প্রত্যাশা করে। সেই দায়িত্ব কর প্রদানের মাধ্যমে প্রতিফলিত হওয়া উচিত।”

মন্তব্য করুন