শরীয়তপুরের উন্নয়নের ইতিহাসে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নদীবেষ্টিত যোগাযোগব্যবস্থা, উচ্চশিক্ষার সীমিত সুযোগ এবং কর্মসংস্থানের অভাব এ অঞ্চলের অগ্রগতিকে চ্যালেঞ্জের মুখে রেখেছে। পদ্মা সেতু চালুর পর যোগাযোগের ক্ষেত্রে যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে একটি বিশেষায়িত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় যুক্ত হলে শরীয়তপুরের অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আসতে পারে। এ বিবেচনায় প্রস্তাবিত ক্যাম্পাসের জন্য ডামুডিয়াকে নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। তবে এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে পরিকল্পনার স্বচ্ছতা, মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণার সুযোগ এবং স্থানীয় মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণের ওপর।

স্বপ্ন থেকে বাস্তবায়নের পথে

শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আইনগত ভিত্তি ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল ‘শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়’ নামটি নির্ধারণ করা হয়। একই বছরের সেপ্টেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হোসেন উদ্দিন শেখরকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে প্রতিষ্ঠানটির প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ দুটি ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ ক্যাম্পাস, অবকাঠামো, একাডেমিক কার্যক্রম ও গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার কাজ বাস্তবায়নই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।

প্রশ্ন হলো, ডামুড্যাই কেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রবিন্দু হবে? এর উত্তর খুঁজতে হবে ভৌগোলিক অবস্থান, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, জমির প্রাপ্যতা, যোগাযোগের সম্ভাবনা এবং আঞ্চলিক ভারসাম্যের সমন্বিত বিবেচনায়।

ডামুড্যা কেন যথার্থ স্থান?

প্রথমত, ডামুড্যা ভেদরগঞ্জ ও গোসাইরহাটের সঙ্গে সংযুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা। শরীয়তপুরের বিভিন্ন অংশের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী মাদারীপুর, চাঁদপুর ও বরিশাল অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্যও পরিকল্পিত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে এটি একটি আঞ্চলিক উচ্চশিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়টি শুধু একটি উপজেলার সম্পদ হবে না; এর সুফল ছড়িয়ে পড়তে পারে বৃহত্তর দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলে।

দ্বিতীয়ত, জয়ন্তী নদীসংলগ্ন প্রস্তাবিত স্থানটি কৃষি গবেষণার জন্য সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি করে। নদীর পানি, বন্যা, জলাবদ্ধতা, মাটির বৈশিষ্ট্য ও নদীনির্ভর কৃষিব্যবস্থা নিয়ে গবেষণার সুযোগ রয়েছে। তবে নদীর নিকটবর্তী হওয়ার কারণে বন্যার ঝুঁকি, ভূমির উচ্চতা, নিষ্কাশনব্যবস্থা ও পরিবেশগত প্রভাব যাচাই করে ক্যাম্পাসের নকশা প্রণয়ন করতে হবে।

তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য পর্যাপ্ত জমি, সম্প্রসারণের সুযোগ এবং তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত নির্মাণব্যয় নিশ্চিত করা জরুরি। জমি অধিগ্রহণের ব্যয়, কৃষিজমির ব্যবহার, পরিবেশের ভারসাম্য ও স্থানীয় মানুষের পুনর্বাসনের বিষয়গুলো বিবেচনা করেই চূড়ান্ত পরিকল্পনা করা উচিত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ। যাঁরা জমি দেবেন বা বসতভিটা ছাড়বেন, তাঁদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ, সম্মানজনক পুনর্বাসন এবং জীবিকা পুনর্গঠনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। মানুষের ত্যাগকে উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

কৃষি গবেষণায় জাতীয় গুরুত্ব

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব এখনো ব্যাপক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪৪.৬৭ শতাংশ কৃষি খাতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪–২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনে কৃষি খাতের অবদান ছিল প্রায় ১০.৯৪ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, কৃষির উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বাড়ানো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। [সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক, বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৪–২৫।]

শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে তাই শুধু ডিগ্রি প্রদানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুললে চলবে না; একে কৃষকের বাস্তব সমস্যার সমাধানকেন্দ্র হতে হবে। বন্যা ও জলাবদ্ধতা সহনশীল ধান ও সবজির জাত উদ্ভাবন, উন্নত বীজ উৎপাদন, মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি, সাশ্রয়ী সেচব্যবস্থা, ফসলের রোগবালাই শনাক্তকরণ, মাছ চাষ এবং প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে গবেষণা চালানো যেতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষামূলক খামার ও গবেষণাগারে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি কৃষকের মাঠে পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, স্থানীয় কৃষক, সমবায়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও গবেষকদের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা গড়ে তুললে গবেষণার ফল সরাসরি উৎপাদন বাড়াতে কাজে লাগবে। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানো, ন্যায্য বাজারমূল্য নিশ্চিত করা এবং ফসলের অপচয় হ্রাস করাই হবে গবেষণার সাফল্যের বাস্তব মাপকাঠি।

কৃষিভিত্তিক শিল্প ও কর্মসংস্থান

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে ডামুড্যা, ভেদরগঞ্জ ও গোসাইরহাটে কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। ফল ও সবজি সংরক্ষণ, হিমাগার স্থাপন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, বীজ উৎপাদন, কৃষিযন্ত্র মেরামত, প্যাকেজিং এবং পরিবহন খাতে বিনিয়োগ বাড়তে পারে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কৃষক শুধু কাঁচা পণ্য বিক্রির ওপর নির্ভরশীল থাকবেন না; প্রক্রিয়াজাত পণ্যের মাধ্যমে অধিক মূল্য সংযোজনের সুযোগও তৈরি হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষিবিজ্ঞান, কৃষি অর্থনীতি, মৎস্যবিজ্ঞান, প্রাণিসম্পদ, খাদ্যপ্রযুক্তি ও কৃষিব্যবসা ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় চালুর সম্ভাবনা বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে বিভাগ ও আসনসংখ্যা নির্ধারণ করতে হবে দেশের জনশক্তির চাহিদা, শিক্ষকপ্রাপ্যতা এবং গবেষণার সক্ষমতা বিবেচনা করে।

শিক্ষক, গবেষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের পাশাপাশি আবাসন, খাবার, পরিবহন, বই-স্টেশনারি, স্বাস্থ্যসেবা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায় নতুন চাহিদা সৃষ্টি হবে। স্থানীয় তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে উন্নয়নের সুফল এলাকার মানুষের কাছে আরও কার্যকরভাবে পৌঁছাবে।

যোগাযোগ অবকাঠামো: সম্ভাবনা ও বাস্তবতা

বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি বিকাশে সড়ক ও রেল যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পদ্মা সেতুর মাধ্যমে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে শরীয়তপুরের যোগাযোগে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন শরীয়তপুর সদর, ভেদরগঞ্জ, ডামুড্যা ও গোসাইরহাটের অভ্যন্তরীণ সড়ক উন্নয়ন, গণপরিবহন, নিরাপদ যাতায়াত এবং কৃষিপণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

পদ্মা সেতু থেকে শরীয়তপুর হয়ে বরিশালমুখী রেলসংযোগের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা ও পরিকল্পনার উদ্যোগ রয়েছে। তবে রেলপথের সম্ভাব্যতা যাচাই, অনুমোদন, অর্থায়ন এবং নির্মাণের অগ্রগতি সম্পর্কে সরকারি তথ্যের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। প্রস্তাবিত রেলপথ বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীদের চলাচল এবং পণ্য পরিবহনে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে, শরীয়তপুর–চাঁদপুর সড়কে মেঘনা নদীর ওপর প্রায় আট কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মহাপরিকল্পনায় সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া নীতিগত অনুমোদন ও পরবর্তী প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমও এগিয়েছে। তবে সেতুটি এখনো নির্মিত হয়নি। [সূত্র: বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ, ২১ এপ্রিল ২০২৬।]

এই যোগাযোগ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মধ্যে যাতায়াত সহজ হতে পারে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এসব প্রকল্পের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। নিজস্ব সড়কসংযোগ, পরিবহনব্যবস্থা ও পর্যায়ক্রমিক উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে যেতে হবে।

সাফল্যের জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ পরিকল্পনা

বিশ্ববিদ্যালয়ের জমির পরিমাণ, মাস্টারপ্ল্যান, অর্থায়ন, নির্মাণের পর্যায়, একাডেমিক কার্যক্রম শুরুর সম্ভাব্য সময়সূচি এবং পরিবেশগত মূল্যায়নের তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা দরকার। দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, আধুনিক গবেষণাগার, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, আবাসিক হল, ডিজিটাল শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতাকে শুরু থেকেই গুরুত্ব দিতে হবে।

একই সঙ্গে কৃষক ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য পরামর্শকেন্দ্র, কৃষিপণ্য প্রদর্শনী, প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে বিশ্ববিদ্যালয় ও জনগণের মধ্যে স্থায়ী সম্পর্ক তৈরি হবে।

এক অঞ্চল, এক স্বপ্ন

ডামুড্যা, ভেদরগঞ্জ ও গোসাইরহাটকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, একই উন্নয়ন অঞ্চলের অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস ডামুড্যায় হলেও এর গবেষণা, প্রশিক্ষণ, কৃষি সম্প্রসারণ ও অর্থনৈতিক সুফল পুরো শরীয়তপুর জেলায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।

শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি হতে পারে কৃষকের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন এবং আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর একটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। স্বচ্ছতা, মানসম্মত শিক্ষা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং মানুষের অধিকার নিশ্চিত করে পরিকল্পিতভাবে এগোতে পারলে ডামুড্যা একদিন দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলের কৃষিশিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

এখন প্রয়োজন ঘোষণাকে কার্যকর বাস্তবায়নে রূপ দেওয়া, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুফল পৌঁছে যায় কৃষক, শিক্ষার্থী, উদ্যোক্তা এবং সমগ্র অঞ্চলের মানুষের কাছে।