বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে শ্রমশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে আসছে। মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং কিছুটা ইউরোপে ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের শ্রমিকদের উপস্থিতি দৃশ্যমান। সম্প্রতি আলবেনিয়া যখন তাদের শ্রমবাজারে নতুন কর্মী আনার পরিকল্পনায় বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, তখন তা নিঃসন্দেহে একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করল। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনের ফাঁকে আলবেনিয়ার প্রেসিডেন্ট বাজরাম বেগাই ও বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের মধ্যে বৈঠকে এ আগ্রহের প্রকাশ বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।

শ্রমবাজারে আলবেনিয়ার আগ্রহ ইউরোপের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি ছোট দেশ আলবেনিয়া। দেশটির অর্থনীতি কৃষি, পর্যটন ও হালকা শিল্পভিত্তিক। শ্রমশক্তির ঘাটতি পূরণের জন্য তারা দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি কর্মীর দিকে ঝুঁকছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের আবেদন করেছে, যা বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, ইউরোপীয় শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মীদের প্রবেশ অনেক ক্ষেত্রে সীমিত। এই প্রেক্ষাপটে আলবেনিয়ার আগ্রহ নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

বাংলাদেশের সম্ভাবনা
বাংলাদেশ একটি তরুণ জনশক্তি নির্ভর দেশ। বিপুল জনগোষ্ঠীর মধ্যে তরুণদের আধিক্য আমাদের জন্য একদিকে সুযোগ, অন্যদিকে চ্যালেঞ্জও বটে। দেশীয় শ্রমবাজারে সবার কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ফলে বিদেশে শ্রমশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে এ চাপ হ্রাস করা এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা বাংলাদেশের কৌশলগত প্রয়োজন। আলবেনিয়ার মতো ইউরোপীয় দেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ কেবল রেমিট্যান্স বাড়াবে না, বরং বাংলাদেশের শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত করতে সাহায্য করবে।

ভিসা জটিলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা
তবে সুযোগ থাকলেও বাস্তবায়নে কিছু বাধা রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশি নাগরিকদের আলবেনিয়ার ভিসার জন্য নয়াদিল্লিতে যেতে হয়। এটি শ্রমিকদের জন্য ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া। প্রেসিডেন্ট বেগাই ই-ভিসা চালুর প্রতিশ্রুতি দিলেও তা দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে শ্রম রপ্তানি সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক (MoU) দ্রুত স্বাক্ষর করতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ। অতীতে আমরা দেখেছি, প্রবাসী শ্রমিকদের দক্ষতার অভাবের কারণে তারা কম মজুরি পান বা অনেক সময় সুযোগ হারান। আলবেনিয়ার শ্রমবাজারে চিকিৎসক, নার্স, কারখানা ও কৃষিশ্রমিকের চাহিদা থাকলে বাংলাদেশকে সেই অনুযায়ী কর্মীদের প্রস্তুত করতে হবে। শুধু প্রেরণ করাই যথেষ্ট নয়, দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে তাদের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিতে হবে।

শিক্ষা ও পর্যটন শ্রমবাজার ছাড়াও আলবেনিয়ার সঙ্গে সহযোগিতার আরও ক্ষেত্র উন্মুক্ত হচ্ছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, আলবেনিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক ভর্তি স্কিমের আওতায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। এর ফলে বাংলাদেশি তরুণদের ইউরোপীয় শিক্ষার সুযোগ বাড়বে। পাশাপাশি পর্যটন খাতে সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেছেন বেগাই। আলবেনিয়ার দক্ষিণ উপকূল বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় হতে পারে। একদিকে শ্রমশক্তি, অন্যদিকে শিক্ষা ও পর্যটন, এই বহুমুখী সহযোগিতা দুই দেশের সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য করণীয়
বাংলাদেশ সরকারকে এখন কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব দিতে হবে,
১. দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক দ্রুত স্বাক্ষর করতে হবে, যাতে শ্রমিক প্রেরণ আইনি সুরক্ষা পায়।
২. ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ করতে হবে। ই-ভিসা চালুর উদ্যোগকে বাস্তবায়ন করতে হবে।
৩. দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি জোরদার করতে হবে, যাতে বাংলাদেশি শ্রমিকরা শুধু সংখ্যায় নয়, দক্ষতায়ও অগ্রগণ্য হয়।
৪. প্রতারণা রোধে কঠোর নজরদারি চালু করতে হবে। অতীতে আমরা দেখেছি, ভিসা বা চাকরির নামে দালালরা শ্রমিকদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে। নতুন এই সুযোগে যাতে কোনো অনিয়ম না ঘটে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
৫. উচ্চপর্যায়ের সফর ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ বাড়াতে হবে। সরকারি-বেসরকারি উভয় পর্যায়ে ধারাবাহিক সংলাপের মাধ্যমে এই সহযোগিতা আরও টেকসই করা সম্ভব।

আলবেনিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার পাওয়া নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। এটি কেবল শ্রম রপ্তানির নতুন সুযোগ নয়, বরং ইউরোপে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার সম্ভাবনাও তৈরি করছে। তবে সুযোগকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষতা উন্নয়ন, ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা অপরিহার্য। অন্যথায় সম্ভাবনা হাতছাড়া হবে।

বাংলাদেশ যদি সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারে, তবে আলবেনিয়া কেবল একটি শ্রমবাজারই নয়, বরং শিক্ষা, পর্যটন ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন সেতুবন্ধন হয়ে উঠতে পারে। আর এভাবেই তরুণ শ্রমশক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারবে।

Facebook Comments Box