গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ:

গণতন্ত্রে সংবাদপত্রকে বলা হয় রাষ্ট্রের “চতুর্থ স্তম্ভ।” আর এই স্তম্ভের কেন্দ্রে অবস্থান করছেন সম্পাদক। তিনি শুধু সংবাদ প্রকাশ করেন না, সংবাদপত্রের নীতি নির্ধারণ করেন, জনমত গঠন করেন এবং সরকারের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেন। ফলে সম্পাদকরা একদিকে রাষ্ট্রের সহযাত্রী, আবার অন্যদিকে সরকারের সমালোচক। এই দ্বৈত ভূমিকাই তাঁদের গুরুত্ব বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।

ইতিহাসের আলোকচ্ছটা:
বাংলাদেশে সম্পাদকদের ভূমিকা মূলত রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গেই মিশে আছে।

১. ব্রিটিশ আমল: ১৮১৮ সালে সমাচার দর্পণ প্রকাশিত হয়। তখনকার সম্পাদকরা ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের কণ্ঠস্বর ছিলেন।

২. পাকিস্তান আমল: ভাষা আন্দোলনের সময় সংবাদ ও আজাদ-এর সম্পাদকরা সাহসিকতার সঙ্গে আন্দোলনকে বেগবান করেন।

৩. মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়: ১৯৭১ সালে দেশ-বিদেশের সাংবাদিক ও সম্পাদকরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বজনমত তৈরি করেন।

৪. স্বাধীনতার পর: শেখ  মুজিবুর রহমান সংবাদপত্রকে আখ্যা দিয়েছিলেন জাতির আয়না হিসেবে। কিন্তু সামরিক শাসনামলে সম্পাদকরা সেন্সরশিপ, মামলা ও নানা দমননীতির শিকার হয়েছেন।

ইতিহাস সাক্ষী, সংবাদপত্র ও সম্পাদকরা কখনো জাতির জাগরণের অগ্রদূত, আবার কখনো ক্ষমতাসীনদের চোখে অস্বস্তিকর সমালোচক।

আইন ও বাস্তবতা:
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—

  • প্রত্যেক নাগরিকের বাকস্বাধীনতা থাকবে।
  • সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকবে।
    তবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, নৈতিকতা বা জনশৃঙ্খলার নামে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা যায়। বাস্তবে এই সীমাবদ্ধতাগুলো প্রায়ই সম্পাদকদের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে।

প্রাসঙ্গিক আইনসমূহ:

  • প্রেস কাউন্সিল আইন, ১৯৭৪
  • তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯
  • ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮
  • সংবাদপত্র ও প্রকাশনা আইন

পরিসংখ্যান:

  • রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (RSF) ২০২৪ সালের সূচকে বাংলাদেশকে ১৬৩তম স্থানে রেখেছে।
  • ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের জরিপে দেখা যায়, ৭২% সম্পাদক সরকারবিরোধী সমালোচনার কারণে বিজ্ঞাপন বন্ধের চাপের মুখে পড়েন।

সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি:
সরকার সাধারণভাবে সম্পাদকদের গণতান্ত্রিক অংশীদার হিসেবে দেখে। জাতীয় উন্নয়ন, সামাজিক সচেতনতা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে সম্পাদকরা ইতিবাচক ভূমিকা রাখেন। অনেক সম্পাদক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও পুরস্কারও পেয়েছেন।

“একজন সম্পাদক জনমত গঠনে সরকারের সহযাত্রী হতে পারেন, তবে সমালোচনামূলক বিশ্লেষণও তাঁর দায়িত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ।”

কিন্তু যখন সম্পাদকরা সরকারের ব্যর্থতা বা দুর্নীতি উন্মোচন করেন, তখন তাঁদের ভূমিকা ক্ষমতাসীনদের কাছে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। ফলে বিজ্ঞাপন বন্ধ, মামলা কিংবা আইনি হয়রানির মতো চাপও তৈরি হয়।

সামাজিক দায়বদ্ধতা:
সম্পাদকরা শুধু সরকারের সমালোচক নন, সমাজের নৈতিক দিকনির্দেশকও বটে। দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, দারিদ্র্য কিংবা নির্বাচনী অনিয়মের মতো বিষয়ে সম্পাদকীয় কলম জনগণের আস্থা তৈরি করে। তবে নিরপেক্ষতা হারালে পাঠকের বিশ্বাস নষ্ট হয়। তাই সম্পাদকদের দায়িত্বশীল, তথ্যনির্ভর এবং পক্ষপাতহীন থাকা জরুরি।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট:

  • যুক্তরাষ্ট্রে Washington Post ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি উন্মোচন করে প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিল।
  • যুক্তরাজ্যে The Guardian সম্পাদকীয় সরকারী নীতিকে প্রভাবিত করেছে বহুবার।
  • ভারতে সংবাদপত্র রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম সহায়ক শক্তি। সেখানে সমালোচনা গণতন্ত্রের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। অথচ বাংলাদেশে সমালোচনাকে অনেক সময় শত্রুতা বা বিরোধিতা হিসেবে দেখা হয়—যা গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার পথে বাধা।

সরকারের জন্য ভবিষ্যতের করণীয়:
১. সমালোচনাকে ভয় নয়, বরং উন্নয়নের সহায়ক শক্তি হিসেবে গ্রহণ করা।
২. সংবাদপত্র সম্পর্কিত আইনগুলো সম্পাদকবান্ধব করা।
৩. রাষ্ট্রীয় প্রকল্প ও বিজ্ঞাপনে বৈষম্য না করা।

সম্পাদকদের জন্য:
১. তথ্যনির্ভর ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা বজায় রাখা।
২. রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে জনআস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।
৩. নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের দায়িত্বশীলতা শেখানো।

বাংলাদেশের সম্পাদকরা সরকারের কাছে কখনো সহযাত্রী, আবার কখনো সমালোচক। তাঁরা রাষ্ট্রের বিবেক, জনগণের প্রতিফলন এবং গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ। সরকারের দৃষ্টিতে তাঁদের সহযোগী ও সমালোচক, এই দ্বৈত ভূমিকাই দেশের গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখে।

“একজন স্বাধীন সম্পাদক মানে শুধু একটি সংবাদপত্র নয়, বরং একটি স্বাধীন জাতি।”

লেখক: শহীদুল ইসলাম পাইলট
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলাম লেখক

Facebook Comments Box