নারীশক্তি দেশের অগ্রযাত্রার মূল চালিকা শক্তি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন, ব্যবসা এবং বিভিন্ন পেশাজীবী ক্ষেত্রের প্রতিটি স্তরে নারীরা ইতিমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং প্রশাসনিক অগ্রগতির পেছনে নারীদের অবদান অনস্বীকার্য। তবে কর্মক্ষেত্রে নারীর স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সচেতনতার বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের সমাজে যথেষ্ট আলোচনা হলেও বাস্তবায়ন প্রায়ই ঝুঁকিপূর্ণ। নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ না থাকা শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা সৃষ্টি করে না, বরং পুরো প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

শরীয়তপুরে সম্প্রতি চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের উদ্যোগে আয়োজিত “কর্মস্থলে নারীস্বাস্থ্য সুরক্ষা” বিষয়ক বিশেষ কর্মশালা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, বিকেল ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত আদালতের এজলাস কক্ষে অনুষ্ঠিত এ কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন অতিরিক্ত চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শর্মীষ্ঠা বিশ্বাস। অনুষ্ঠানে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট লাভলী শীল সঞ্চালনা করেন এবং প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডা. হোসনে আরা রোজি, সিনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনী ও অবস্টেট্রিক্স), ১০০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতাল, শরীয়তপুর।
উক্ত কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন আদালতের নারী ম্যাজিস্ট্রেট, নারী কর্মচারী এবং নারী আইনজীবীরা। শর্মীষ্ঠা বিশ্বাস তার স্বাগত বক্তব্যে বলেন, “বাংলাদেশে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে নারীরা তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছেন। কর্মক্ষেত্রেও তারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তবে প্রতিকূল পরিবেশেও নারীস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতন থাকা জরুরি।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা শুধু নারী কর্মীদের অধিকার নয়, এটি একটি সামাজিক এবং মানবিক দায়বদ্ধতা।
ডা. হোসনে আরা রোজি তার আলোচনায় প্রধানত তিনটি বিষয় তুলে ধরেন – বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা, করণীয় এবং প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ। তিনি ব্যাখ্যা করেন, কর্মক্ষেত্রে নারীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি শুধুমাত্র শারীরিক নয়; মানসিক স্বাস্থ্যও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা, মানসিক চাপ, অনিয়মিত বিশ্রাম এবং পর্যাপ্ত খাদ্যাভ্যাস না থাকা নারীদের জন্য জটিল স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। তিনি বলেন, “কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সুরক্ষা একটি নীতিমালা দ্বারা নিশ্চিত করা উচিত, যা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক হবে।”
কর্মশালায় আলোচ্য বিষয়ের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো মেনস্ট্রুয়াল হেলথ, গর্ভাবস্থা এবং সন্তান লালন, মানসিক চাপ, সুষম খাদ্য এবং শারীরিক ব্যায়াম। ডা. রোজি বলেন, “প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নারী কর্মীদের জন্য স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সেবার ব্যবস্থা, যেমন স্বাস্থ্য পরামর্শ, জরুরি চিকিৎসা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা থাকা অত্যন্ত জরুরি।” তিনি উল্লেখ করেন, যে দেশে নারীর স্বাস্থ্য সচেতনতা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে, সেখানে নারীর কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়বে।
প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশগ্রহণকারীরা তাদের বাস্তব সমস্যা তুলে ধরেন। অনেকেই বলেন, দৈনন্দিন কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সুরক্ষার অভাবের কারণে কর্মক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং মানসিক চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ডা. রোজি অংশগ্রহণকারীদেরকে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য রক্ষণ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত ব্যায়ামের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এছাড়াও, তিনি কর্মস্থলে স্বাস্থ্য সচেতনতার জন্য নিয়মিত ওয়ার্কশপ এবং পরামর্শ প্রদান করার পরামর্শ দেন।
সমাপনী বক্তব্যে শর্মীষ্ঠা বিশ্বাস বলেন, “নারীস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ধারাবাহিক সচেতনতা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া জরুরি। এটি শুধু নারী কর্মীদের জন্য নয়, বরং পুরো সমাজের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।” তিনি কর্মশালার সমাপ্তি ঘোষণা করার আগে আরও বলেন, “একজন সুস্থ নারী একজন সমাজের সুস্থ নাগরিক। তার স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করাই সমাজ ও রাষ্ট্রের অগ্রগতির মূল ভিত্তি।”
কর্মক্ষেত্রে নারীস্বাস্থ্য: বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র:
বাংলাদেশে নারীর কর্মসংস্থানের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু স্বাস্থ্য সচেতনতা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ এখনও প্রায়শই সীমিত। শিল্পখাত, প্রশাসন এবং শিক্ষাখাতের নারী কর্মীরা দৈনন্দিনভাবে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করছেন, যা মানসিক ও শারীরিক চাপ সৃষ্টি করে। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সুরক্ষার অভাবের ফলে মহিলাদের মধ্যে কম্পন, মাথা ব্যথা, অনিদ্রা, পিঠের ব্যথা এবং মানসিক চাপের সমস্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপ্রাপ্ত নারীদের প্রায় ৪০% কর্মক্ষেত্রে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সুবিধা পান না। এর মধ্যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্যানিটেশন, বিশ্রামের সুযোগ এবং জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত। এর ফলে কর্মক্ষমতা কমে যায়, মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায় এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও শিক্ষণীয় উদাহরণ:
বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশ কর্মক্ষেত্রে নারীস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ নীতি প্রণয়ন করেছে। যেমন, নরওয়ে, সুইডেন এবং জার্মানিতে কর্মস্থলে নারীদের জন্য স্বাস্থ্যপরামর্শ, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং মাতৃত্বকালীন সুবিধা বাধ্যতামূলক। এছাড়াও, শর্তসাপেক্ষে ফ্লেক্সিবল ওয়ার্ক আওয়ার, শিশু যত্ন সুবিধা এবং জরুরি মেডিকেল সাপোর্ট প্রদানের মাধ্যমে নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
বাংলাদেশও এই দিকগুলো থেকে শিক্ষা নিতে পারে। আদালত, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং অফিসগুলোতে নারী কর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য নীতিমালা প্রণয়ন এবং নিয়মিত সচেতনতা কর্মসূচি চালানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আইনগত ও নীতিগত দিক:
বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে নারী কর্মীদের অধিকার সংরক্ষণের জন্য কিছু আইন এবং নীতিমালা বিদ্যমান। “মহিলা ও শিশু নিরাপত্তা আইন ২০০০”, “শ্রম আইন ২০০৬” এবং “মাতৃত্বকালীন সুবিধা বিধিমালা” এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। তবে বাস্তবায়ন এখনও অনেকাংশে দুর্বল। আদালত ও প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত ওয়ার্কশপ এবং পরামর্শ প্রদান করে এই আইন বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব।
সামাজিক ও মানসিক প্রেক্ষাপট:
নারী কর্মীরা প্রায়শই পারিবারিক দায়িত্ব, সামাজিক প্রত্যাশা এবং পেশাগত চাপে পড়েন। এতে মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায় এবং স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হয়। এই চাপ কমাতে কর্মক্ষেত্রে পরামর্শ সেবা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মসূচি অপরিহার্য।
করণীয়:
১. প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নারী কর্মীদের জন্য স্বাস্থ্য নীতি প্রণয়ন করবে।
২. নিয়মিত স্বাস্থ্য পরামর্শ ও ওয়ার্কশপ আয়োজন করা।
৩. মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রদান নিশ্চিত করা।
৪. কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
৫. সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নির্ধারিত স্বাস্থ্য নীতি অনুসরণ নিশ্চিত করা।
শরীয়তপুরের এই কর্মশালা একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে যে, নারীস্বাস্থ্য সচেতনতা নিশ্চিত করা শুধু কর্মীদের জন্য নয়, পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য।
লেখক: শহীদুল ইসলাম পাইলট, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।




মন্তব্য করুন