প্রতিক্ষণ নানা ঝুঁকি ও শংকা নিয়ে জীবন চলে তাদের। নিরাপত্তার বেড়াজালে আটকে আছে তাদের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন। তারা না পারছে বাপ- দাদার ভিটে- মাটি ছাড়তে, না পারছে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে। অনিশ্চিত জীবনের মধ্যেও মুক্তির পথ খুঁজছে তারা।
বলছি বিশ্বের বৃহত্তম শরনার্থী ও রোহিঙ্গা ক্যাম্প টেকনাফ – উখিয়ার সীমান্ত এলাকার মানুষের কথা।
যাদের নেই স্বাধীনতা, নেই নাগরিক অধিকার, নেই বেঁচে থাকার অবলম্বন।

সীমান্তে মিয়ানমারের দুই গ্রুপের যুদ্ধের প্রভাবে সবসময় উদ্বিগ্ন থাকে সীমান্তবাসী। মিয়ানমার থেকে উড়ে আসা মটরসেলে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়, নিহত হয় রোহিঙ্গাও। আহত হয়েছে সীমান্তের অসংখ্য মানুষ। মাইন বিস্ফোরণে হতাহত হচ্ছে প্রতিনিয়ত স্থানীয় কৃষিজীবীরা। সময়ে সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। সীমান্ত জুড়ে অপহরণ, মাদক, মানবপাচার, অস্ত্রপাচার। যার কারণে বিশ্বের ভয়ংকর সীমান্ত হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে বাংলাদেশ – মিয়ানমার সীমান্ত। এ জন্য বাংলাদেশ সরকার কঠোর নিরাপত্তা জোরদার করেছে। এই নিরাপত্তা উল্টো সীমান্তে থাকা নাগরিকদের বেঁচে থাকা কাল হয়ে দাড়িয়েছে। এরমধ্যে সীমান্তের ৫ হাজার জেলে পরিবারের জীবন দূর্বিসহ হয়ে উঠেছে।

টেকনাফ হ্নীলা জলদাস পাড়ার ৭০ বছর বয়সী সমপ্তি দাস। ৯৬ বছর বয়সী মাকে নিয়ে জাল তৈরি করে কোনমতে দুমুঠো ভাত খেয়ে বাঁচার চেষ্টা করেন। কিন্তু এখন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় জেলেদের জালের প্রয়োজন নেই। তাই জাল তৈরির কাজও বন্ধ।

সমপ্তি দাস জানান -একসময় এই জেলেপল্লি ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যে ভরপুর। বিভিন্ন এলাকার লোকজন সেখানে গিয়ে আয়-রোজগার করতেন। নাফ নদী থেকে ধরা তাজা মাছ এবং মাছকে রোদে শুকিয়ে উৎপাদিত শুঁটকি সরবরাহ করা হতো টেকনাফ, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এলাকায় ছিল না কোনো অভাব-অনটন।এখন পুরো পল্লি যেন মৃত্যুপুরী। জেলে পল্লীর চুলায় আগুন জ্বলেনা। নিরাপত্তার অজুহাতে নাফ নদীতে ৮ বছর ধরে জেলেদের মাছ ধরা বন্ধ।

শুধু সমপ্তি দাস নয় তার মত হ্নীলা জলদাস পাড়ার শত শত পরিবার অর্ধাহারে অনাহারে দিনাতিপাত করছে।

একটি ঝুপড়িঘরের মেঝেতে ব্যথায় কাতরাচ্ছেন অসুস্থ জেলে নবী হোসেন। স্ত্রী মোস্তফা খাতুন বলেন, ওষুধ কেনার টাকা নেই। মাছ ধরা বন্ধ মানে আয়–রোজগারও বন্ধ।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে নাফ নদীর ওপর দিয়ে রোহিঙ্গাদের ঢল শুরু হয়। তখন এই ঢল থামানোর জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি পরিপত্র জারি করা হয়। সঙ্গে নাফ নদীতে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। কিন্তু ৮ বছরেও সেই আদেশ প্রত্যাহার করা হয়নি। নাফ নদীতে মাছ ধরার বিষয়টি তদারক করছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি।
জালিয়াপাড়া ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি আবদুল গনি বলেন, ‘দীর্ঘ চার বছর ধরে নাফ নদীতে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় জেলেদের কোটি টাকা বিনিয়োগে তৈরি দুই শতাধিক নৌযান ও মাছ ধরার জাল নষ্ট হচ্ছে।

হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আলী আহমেদ বলেন, টেকনাফের প্রায় ৫ হাজার জেলে পরিবার নাফ নদীর উপর নির্ভরশীল। কিন্তু নিরাপত্তার নামে সামরিকরণ করার কারণে ৮ বছর ধরে নাফ নদীতে মাছ ধরতে পারছেনা তারা। মাছ ধরা বন্ধ হলেও সীমান্তের অপরাধ বন্ধ হয়নি। বরঞ্চ আরো বেড়ে গেছে।
জেলে পরিবারে অভাব-অনটন চলছে। পেশা হারিয়ে অধিকাংশ পরিবার নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে ধার-দেনা ও অন্যের সাহায্যের ওপর।
সরকার এ ব্যাপারে এগিয়ে না আসলে টেকনাফ জেলে পল্লীর মানুষকে না খেয়ে মরতে হবে।

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, নিরাপত্তা জটিলতার কারণে সীমান্তে থাকা বাংলাদেশীদের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়লে তাদের সীমান্ত থেকে সরিয়ে অন্যত্র পুনবার্সন করা এবং আয় রোজগারের ব্যবস্থা করে দেয়া প্রয়োজন।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ এহসান উদ্দিন, জেলে পরিবারগুলোর অমানবিক জীবনযাপনের কথা বিবেচনা করে গত ৫ আগস্টের পর নাফ নদীর কিছু অংশ তথা শাহপরীর দ্বীপ অংশে দিনের বেলায় মাছ ধরার অনুমতি রয়েছে। তবে নাফ নদীর অন্য কোথাও মাছ ধরা যাবে না।

Facebook Comments Box