নড়াইল সদর উপজেলার শাহাবাদ ইউনিয়নের সরসপুর গ্রামের তরুণ কৃষক অসিত বসু। নিজের উদ্যোগে মাশরুম চাষ শুরু করে তিনি হয়ে উঠেছেন একজন সফল উদ্যোক্তা। গ্রামের সরল ছেলেটি এখন এলাকার অনুপ্রেরণা। মাটির গন্ধ, কৃষকের ঘাম আর নতুন কিছুর খোঁজ তাকে আজ ভিন্ন এক পরিচয়ে পরিচিত করেছে। তার প্রচেষ্টা শুধু ব্যক্তিগত জীবনে পরিবর্তন আনেনি, বদলে দিচ্ছে আশপাশের মানুষের স্বপ্ন আর চিন্তাভাবনাও।

অসিতের গল্পটা শুরু হয়েছিল একেবারেই ছোট পরিসরে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের ঘরের এক কোণে শুরু করেন মাশরুম চাষ। প্রথমে মাত্র ৫০টি স্পন দিয়ে শুরু করেছিলেন তিনি। ধীরে ধীরে সেই স্বপ্নের বীজ বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার স্পনের খামারে। প্রতিটি প্যাকেট তৈরি হয় খড়কুটো, কাঠের গুঁড়া, গম ও ধানের ভুসি, ক্যালসিয়াম চুন ও পানি দিয়ে। খরচ পড়ে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ টাকা। এরপর বিশেষ পরিবেশে ২৮ দিন ল্যাব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মাদার টিস্যু তৈরি করে দেওয়া হয় স্পন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সাদা ঝরঝরে মাশরুম ভরে ওঠে প্যাকেটগুলো।

বর্তমানে তার খামারের দুই হাজার প্যাকেটের মধ্যে প্রায় ২৫০ প্যাকেটে নিয়মিত মাশরুম উৎপাদিত হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে দুই কেজি মাশরুম বিক্রি হচ্ছে স্থানীয় বাজারে, কেজি প্রতি প্রায় ৬০০ টাকায়। এতে মাসে আয় হচ্ছে ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা। শুধু তাই নয়, গত বছর তারুণ্যের মেলায় মাশরুম দিয়ে বানানো চপ বিক্রি করে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা লাভ করেছিলেন অসিত।

নিজের সাফল্যের গল্প বলতে গিয়ে তিনি বলেন, আমি কৃষক পরিবারের সন্তান। কৃষি অফিসের সহযোগিতায় ঢাকায় ১০ দিনের প্রশিক্ষণ নিয়েছি। পরে অফিস থেকে উপকরণ ও বাজারজাতকরণের জন্য একটি ভ্যান গাড়িও পেয়েছি। শুরুতে ভেবেছিলাম টিকতে পারব কিনা। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, মাশরুম চাষ দিয়েই জীবনের বড় স্বপ্ন পূরণ সম্ভব।

অসিতের খামারকে ঘিরে স্থানীয় যুবকদের কৌতূহলও বাড়ছে। কেউ কাজ শিখতে আসছেন, কেউ আবার শুরু করার পরিকল্পনা করছেন। স্থানীয় যুবক আরাফাত হোসেন বলেন, প্রতিদিন অসিত বাবুর খামারে কাজ করি। অনেক কিছু শিখেছি। অল্প সময়ের মধ্যে আমিও মাশরুম চাষ শুরু করতে চাই।

অসিতের স্বপ্ন এখানেই থেমে নেই। তিনি চান, বড় আকারে বাণিজ্যিক মাশরুম খামার গড়ে তুলতে এবং অন্যদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আত্মকর্মসংস্থানের পথ দেখাতে। তার দৃঢ় বিশ্বাস শহরে না গিয়েও গ্রামে বসেই স্বপ্ন পূরণ করা যায়, যদি থাকে ইচ্ছাশক্তি আর সঠিক দিকনির্দেশনা।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মাশরুম শুধু সুস্বাদু নয়, পুষ্টিগুণেও ভরপুর। এতে রয়েছে উচ্চমাত্রার প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান। তাই দেশে–বিদেশে এর চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে গ্রামের তরুণরা এই খাত থেকে যেমন ভালো আয়ের সুযোগ পাবে, তেমনি দেশের অর্থনীতিতেও যোগ হবে নতুন সম্ভাবনা।

নড়াইল সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রোকনুজ্জমান বলেন, অসিত বসুর প্রেরণায় প্রায় ৩০ জন ছোট উদ্যোক্তা মাশরুম চাষে যুক্ত হয়েছেন। এভাবে এগোতে থাকলে সরসপুর গ্রাম ক্রমে মাশরুম পল্লীতে রূপ নিতে পারে। বাজার ইতোমধ্যেই তৈরি হয়ে গেছে, ফলে বিক্রি নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। এটি নারী ও যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য অনন্য সুযোগ।

Facebook Comments Box