“নিরব ছোঁয়ায় বদলেছে পরিবেশ: ৫ বছর পূর্তি গ্রিন পিস ইয়ুথের অভিজ্ঞতা”
“জলবায়ু পরিবর্তন রুখে দাঁড়াচ্ছে তরুণরা: খাইরুলের হাত ধরে উপকূলে স্বপ্নযাত্রা”

জলবায়ু পরিবর্তন রুখে দাঁড়াচ্ছে তরুণরা: খাইরুলের হাত ধরে উপকূলে স্বপ্নযাত্রা
উপকূলীয় জনপদ বরগুনার এক তরুণ খাইরুল ইসলাম মুন্না। ছোটবেলা থেকেই মানুষের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন লালন করা মুন্না আজ হাজারো তরুণের প্রেরণার নাম। তাঁর হাত ধরে গড়ে উঠেছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন “গ্রিন পিস ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি”, যা আজ উপকূলের তরুণদের জীবনে আশার আলো হয়ে উঠেছে। বর্তমানে তিনি অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা ও মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে অধ্যয়নরত।
শৈশবে বাংলাদেশ স্কাউটের কার্যক্রম দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে মুন্না ২০১৬ সালে যোগ দেন বেতাগী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের স্কাউট ইউনিটে। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর স্বেচ্ছাসেবী জীবনের যাত্রা। তবে একটি বড় বাঁক আসে ২০২০ সালের মহামারির সময়। চারদিকে ভয়, হতাশা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বাল্যবিয়ের প্রবণতা ভয়াবহভাবে বাড়তে থাকে। তখন মুন্না এবং তাঁর সহযোদ্ধারা তদন্ত করে দেখেন জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকটই মূলত বাল্যবিবাহ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। লবণাক্ত পানির কারণে ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, পরিবারগুলো অর্থনৈতিক চাপে পড়ে মেয়েদের অল্প বয়সেই বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছিল। সেই সময় গ্রিন পিস ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির সূচনা হয় মাত্র ৪০ সদস্য নিয়ে। তারা প্রথম উদ্যোগেই প্রতিরোধ করে ৭টি বাল্যবিয়ে।
আজ সেই সংগঠন চার শতাধিক সদস্য নিয়ে কাজ করছে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায়। তাদের কর্মক্ষেত্র বিস্তৃত হয়েছে খাদ্য সহায়তা থেকে শুরু করে নারী স্বাস্থ্য সচেতনতা (অপরাজিতা), শিক্ষা সহায়তা, কর্মসংস্থান উন্নয়ন (দক্ষতা বৃদ্ধি প্রশিক্ষণ) এবং পরিবেশ সচেতনতা (ক্লাইমেট অ্যাকশন) পর্যন্ত।
২০২৫ সালের ২৫ জুন সংগঠনটি সরকারিভাবে নিবন্ধন লাভ করে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, বরগুনা থেকে। নিবন্ধন নম্বর যু.উ.অ. বরগুনা-০৪৯।
কোভিড-১৯ মহামারির কঠিন সময়ে তারা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে মাস্ক বিতরণ, মৃত ব্যক্তিদের গোসল ও দাফন সম্পন্ন করা থেকে শুরু করে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রেখে। ইস্পাহানী ইসলামীয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগিতায় ৪০০ জনকে বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা ও ৩৫ জনকে ছানি অপারেশনের সুযোগ দিয়েছে, তীব্র গরমে সাত দিন প্রায় চার হাজার মানুষকে ঠান্ডা পানি শরবত বিতরণ, পবিত্র ঈদুল আজহা এবং ঈদুল ফিতরে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে মেহেদী উৎসব,বিশ্ব পানিতে ডোবা প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে শিশু সমাবেশ আয়োজন,
সংগঠনটি শুধু জরুরি সহায়তাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। উপকূলের তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ‘ট্রেনিং অন ইয়ুথ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ক্লাইমেট অ্যাকশন’ আয়োজন করে, যেখানে দুই শতাধিক তরুণ-তরুণী জলবায়ুবিষয়ক জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করে। এছাড়া তারা সক্রিয় থেকেছে গ্লোবাল ক্লাইমেট স্ট্রাইক, ইয়ুথ ক্লাইমেট সামিট, কোস্টাল ক্লাইমেট টক, গ্লোবাল উইক অব ক্লাইমেট অ্যাকশনসহ নানা আন্তর্জাতিক আন্দোলন ও আলোচনায়। তাদের উদ্যোগগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে প্রশংসিত “প্রকৃতির ডাক: জারি গানে ন্যায্য রূপান্তর”, গোলটেবিল “কোস্টাল টু ন্যাশনাল: ইউথ চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড অপরচুনিটিজ”, উপকূলীয় জলবায়ু যুব সংলাপ, রিজিওনাল ইয়ুথ কপ, রিজিওনাল ক্লাইমেট অলিম্পিয়াড, আইসিটি অলিম্পিয়াড এবং মাসিক আড্ডা ‘ইউথ ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক ওয়াইক্যান আড্ডা ।
“আমাদের সংগঠনের মূল শক্তি হলো আমাদের নিজেদের সদস্যরা। আমরা নিয়মিতভাবে সদস্য ও কমিটির সবার কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহ করি। পাশাপাশি বিভিন্ন সময় স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে ডোনেশন সংগ্রহ করি। শুধু তাই নয়, সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও বিভিন্ন এনজিওর সহযোগিতার মাধ্যমে আমরা আমাদের কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যাই। এই যৌথ উদ্যোগই আমাদের সংগঠনের প্রতিটি কাজে প্রাণ সঞ্চার করে।”
সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক খাইরুল ইসলাম মুন্না বলেন “আমি ছোটবেলা থেকেই দেখেছি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমাদের উপকূলের মানুষ কত কষ্টে বাঁচে। ঘূর্ণিঝড়ে ঘর ভেঙে যায়, লোনা পানিতে ফসল নষ্ট হয়, আর সেই দারিদ্র্যের চাপেই বাড়ে বাল্যবিয়ে। তখনই আমি বিশ্বাস করেছি সমাজে বড় পরিবর্তন আনতে বড় কিছু করার দরকার নেই, বরং ছোট ছোট মানবিক উদ্যোগই পারে আলো ছড়াতে। আমাদের সংগঠনে প্রতিনিয়ত নতুন তরুণরা যুক্ত হচ্ছে। আমি তাদের বলি জলবায়ুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে আগে স্বপ্ন দেখতে হবে, তারপর সেই স্বপ্নকে কাজে রূপ দিতে হবে। যে কোনো জায়গা থেকে শুরু করা যায়, যে কাউকে সঙ্গে নিয়ে কিংবা প্রয়োজনে একা। কারণ একা হলেও আপনি নিজেই হতে পারেন আপনার গল্পের নায়ক, আপনার গ্রামের পরিবর্তনের আলো।”




মন্তব্য করুন