বুধবার, ২৮শে জুলাই, ২০২১ ইং, ১৩ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৮ই জিলহজ্জ, ১৪৪২ হিজরী
বুধবার, ২৮শে জুলাই, ২০২১ ইং

শরীয়তপুরে নৌকা তৈরির উপর নির্ভরশীল ৩০ পরিবার

শরীয়তপুরে নৌকা তৈরির উপর নির্ভরশীল ৩০ পরিবার

শরীয়তপুর জেলার সদর উপজেলার রুদ্রকর ইউনিয়নের চন্দনকর এলাকার এখনও নিয়মিত নৌকা। নৌকায় তাদের একমাত্র ভরসা। তাই এই গ্রামটি নৌকার গ্রাম নামে পরিচিত।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, নিচু অঞ্চল হিসেবে পরিচিত ছিল এই শরীয়তপুর। বর্ষার দিনে বিলছে বিল পানি আর পানি থাকতো । ৬ মাস পানির নিচে থাকতো এই অঞ্চলে বিভিন্ন এলাকা। তখন মানুষের চলাচলের জন্য ব্যবহার হত নৌকা। এই জেলায় ব্যবহারকৃত নৌকা বেশির ভাগই রুদ্রকরের চন্দনকর এলাকার নৌকা গ্রাম থেকে নিতেন ক্রেতারা। এখানে নৌকায় বানানো হত বলে এলাকার নাম চন্দনকর বা নৌকা গ্রাম নামে পরিচিত।

৭ জুলাই বুধবার সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, রুদ্রকর ইউনিয়নের চন্দন কর এলাকায় নৌকা তৈরি কাজ চলছে পুরোদমে। ঘরের পাশেই নৌকা বানানোর কাঠ আর বড় জায়গা রয়েছে। সেখানে কাজ করছে নৌকা বানানোর শ্রমিকরা। ছোট থেকে বড় সকল বয়সী মানুষই নৌকা বানানোর কাজ করে। নৌকা শ্রমিকরা মনোযোগ দিয়ে কাজ করে চলছে। কেউ কাঠ কাটছে, কেউ নৌকায় পেরেক মারছে। নৌকার ডাইসের মাধ্যমে ই কাঠ কেটে নৌকার পাটাতন বানাচ্ছে। কেউ কাঠ কাটার পর তা আবার সমান করছেন ডাইস্ বসানোর জন্য।

নৌকা বানানোর মিস্ত্রীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, একটি ছোট নৌকা বানাতে ২ দিন সময় লাগে আর বড় হলে ৩ দিনের প্রয়োজন হব। আগে গাছের কাঠের দাম কম হওয়ায় নৌকা বানাতে তেমন খরচ পড়ত না। বিভিন্ন মালামাল কিনে ছোট নৌকা বানাতে এখন ৬ থেকে ৮ হাজার টাকা গুনতে হয়। তাতে ক্রেতারা নিতে কিছু টা হিমসিম খেচ্ছে। সব কিছু ই দাম এখন বৃদ্ধি। গতবছর আর এবছর ছোট আর মাঝারী সাইজের নৌকা বেশি চাহিদা। বড় নৌকা বানাতে যেই খরচ তার থেকে কিছুটা কম খরচ হয় মাঝারি সাইজের নৌকা বানাতে।

নৌকা কিনতে আসা কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে এই গ্রামে ই নৌকা বানানোর কাজ করে আচ্ছে কিছু পরিবার। তাদের মধ্যমে ই এই জেলার বিভিন্ন প্রান্তরে নৌকা তৈরি করে নিয়ে যাচ্ছে ক্রেতা বা নৌকা বিক্রেতারা। আগে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা দিয়ে বড় একটি নৌকা পাওয়া যেত। এখন সেই নৌকা কিনার জন্য গুনতে হচ্ছে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত। তাও খাজনা ও ভাড়া ছাড়া। এতে করে নৌকা কিনে ব্যবহার করা গেলেও কিনে বিক্রি করা টা অনেক সমস্যার ব্যপার হয়ে দাড়ায়।

নৌকা মিস্ত্রী সঞ্জয় মন্ডল বলেন, বাবার সাথে হাত ধরে কাঠের কাজ শিখেছি। আর অন্য কোন কাজ করতে পারি না। এই নৌকা বানানোর বছরে তিন থেকে চার মাস চাহিদা থাকে। এটির চাহিদা শেষের পর গ্রামে গিয়ে গিয়ে কাঠের কাজ করি। কিন্ত করোনা আসার পর এটি অনেকটা নাই বললে ই চলে। কষ্ট করে নৌকা বানিয়ে তারপর সংসার চালাতে হয়।

আরেক মিস্ত্রী ফুর্তি মৃধা বলেন, বাবা দাদারা এই কাজ করতেন। তাদের কাছ থেকে শিখেছি। একটি নৌকা বানাতে সময় লাগে দুই থেকে তিন দিন। তাও একটি নৌকা বেচলে দের দুই হাজার টাকা লাভ হত। আর এখন একটি নৌকা বিক্রি করলে হাজিরার টাকাটাও ওঠাতে অনেক কষ্ট হয়ে যায়। তারপরও কষ্ট করে বাপ দাদাদের কাজটি ধরে রেখেছি।

হৃদয় বৈরাগী নামের আরেক মিস্ত্রী বলেন, কাঠের দাম বৃদ্ধি লোহার দাম বৃদ্ধি। গত বছর যেই লোহা কিনেছি ৬০ থেকে ৭০ টাকা এবার তার দাম ১২০ থেকে ১৩০ টাকা পর্যন্ত। দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এতে করে সব কিছুর সাথে সাথে নৌকারও দাম বেড়েছে।

নৌকা কিনতে আসা আনোয়ার হোসেন বলেন, নৌকা কিনতে এসে পড়েছি বিপাকে। কারণ কি জানতে চাইলে বলেন, নৌকার গায়ে আগুন। পানি বন্ধি হয়ে থাকতে হবে যদি নৌকা না কিনি। আর তার থেকে বড় কথা নৌকা না নিলে বর্ষায় গরু ছাগল না খেতে পেয়ে মরবে। বর্ষায় পুরো এলাকা পানির নিচে চলে যায়। মাঠে পানি থাকায় ঘাস পাওয়া মসকিল হয়ে যায়। নৌকা থাকলে কচুরি কেটে আনলে তা খেতে পারবে।

আরে ক্রেতা হারুন বেপারী বলেন, নৌকা গ্রামের অনেক নাম ডাক। এখানের নৌকা যায় না এমন কোন এলাকা নেই। এই অঞ্চলে বর্ষার দিনে নাকাশ ছাড়া চলাচল করা অনেক কষ্ট। বেশির ভাগ এলাকায় বর্ষার প্রধান বহন হয়ে যায় এই নৌকা। এবার নৌকার দাম অনেক বেড়ে গেছে। এতে করে অনেকে ই নৌকা কিনতে পারবে বলে মনে হয় না। তবে এখান কার নৌকা গুলো টেকশই ও বেশি দিন ব্যবহার করা যায়।

রুদ্রকর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মজিবর রহমান খোকন বলেন, চন্দনকর এলাকায় বেশির ভাগ মানুষ চার মাস নৌকা বানায়। আর অন্য সময় অন্য কাজ করে। তারা বিভিন্ন বাহারী ডিজাইনে এই নৌকা বানান। তাদের নৌকা জেলা বিখ্যাত নৌকা।

রুদ্রকর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান দৈনিক রুদ্রবার্তাকে বলেন, বৃষ্টির দিন নিচু এলাকায় নৌকার গুরুত্ব অপরিসীম। আদি আমল থেকে নৌকা বানিয়ে আসছে চন্দনকর গ্রামের লোকজন। তবে কালের বিবর্তনে অনেকেই এই পেশা বা এলাকা ছেড়ে চলে গেছে অন্য জায়গায়। তবে নামটি রয়ে গেছে। এই করোনাকালীন মহামারীর সময় নৌকা তৈরির কারিগরদের প্রণোদনার বিষয়টি মাসিক সভায় ইউএনও মহোদয়ের সাথে আলোচনা করবো।