শরীয়তপুরের পদ্মা ও মেঘনা নদীতে মাছ ধরার সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি থাকলেও জীবিকার তাগিদে নদীতে নামতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক জেলে। পরিবার-পরিজনের মুখে খাবার তুলে দিতে কিংবা এনজিওর কিস্তি ও মহাজনের দাদন শোধ করতে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই জাল ফেলছেন তারা।

স্থানীয় জেলেরা জানান, জেলেদের বড় একটি অংশ স্থানীয় বিভিন্ন এনজিও বা মহাজনের কাছ থেকে সুদে টাকা নিয়ে মাছ ধরার সরঞ্জাম কিনেছেন। এখন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় তাদের আয়ের পথ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ প্রতি সপ্তাহে কিস্তি আদায়ে মাঠে নেমেছে এনজিও কর্মীরা। বাধ্য হয়েই অনেক জেলে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে রাতের অন্ধকারে নদীতে নামছেন।

বুধবার বিকেলে উপজেলার কাঁচিকাটা মরিচা কান্দি এলাকায় ৪ থেকে ৫ জন নিয়ে মাছ ধরতে দেখা যায় জেলে লাল মিয়া সরদারকে। পাশেই মা ইলিশ শিকার করছেন আরেক জেলে জসিম। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই নদীতে অবাধে মাছ ধরছেন তাদের মতো আরও বহু জেলে। জেল-জরিমানার পরও থামান যাচ্ছে না তাদের। তাদের দাবি, ঋণের চাপ ও সরকারি সহায়তা না পেয়ে অনেকটা বাধ্য হয়েই নদীতে নামছেন তাঁরা। অনেক জেলে নদী পাড়েই বিক্রি করছে ইলিশ।

উপজেলা মৎস্য বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অক্টোবরের ২২ দিন (৪-২৫ অক্টোবর) মা-ইলিশ ডিম ছাড়তে নদীতে আসে। পদ্মা-মেঘনা দেশের অন্যতম মৎস্য প্রজনন অভয়াশ্রম। শরীয়তপুরের পদ্মা ও মেঘনা নদীর অভয়াশ্রম জলসীমায় জাল ফেলা, ইলিশ মাছ শিকার, বহণ, মজুত ও ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ। একটি মা ইলিশ নদীতে পাঁচ-ছয় লাখ ডিম ছাড়ে। নিষেধাজ্ঞা মেনে যদি সঠিকভাবে মা ইলিশের ডিম ছাড়ার পরিবেশ তৈরি করা যায় এবং জাটকা সংরক্ষণ করা যায়, তাহলে দেশের মানুষের ইলিশ মাছের চাহিদা পূরণ করে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব।

জেলে লাল মিয়া সরদার বলেন, সপ্তাহ খানেক নদীতে নামতে পারিনি। ঘরে চাল নাই, বাচ্চারা না খেয়ে থাকে। এনজিওর কিস্তি দিতে না পারলে বাড়িতে এসে গালাগাল দেয়। তাই বাধ্য হয়ে দুদিন ধরে নদীতে মাছ ধরছি। জানি নিষেধ আছে, তবুও পেটের দায়ে নামতেই হয়।

চাঁদপুর থেকে ভেদরগঞ্জের কাঁচিকাটায় মাছ শিকারে এসেছেন জেলে জসিম। তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞা মানলে সন্তানদের না খেয়ে থাকতে হয়। এনজিওর কিস্তির টাকা না দিলে মামলা দেয়। নদীতে না নামলে সংসার চলে না তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাছ ধরি। আমাদের চাঁদপুরে যখন প্রশাসনিক চাপ থাকে তখন শরীয়তপুরে এসে মাছ ধরি, শরীয়তপুরে চাপ পড়লে চাঁদপুরে চলে যাই। কিছু করার নেই! মহাজন দাদন দিছে মাছ ধরার জন্য। মাছ না ধরলে মহাজনের দাদনের টাকা ফেরত দিতে হবে। তাই বাধ্য হয়ে পরিবারের কথা চিনতে করে নদীতে মাছ ধরি।

সখিপুরের স্থানীয় জেলে আলি বেপারী বলেন, ভিজিএফ চাল পাইনি। যাদের নাম তালিকায় আছে তারাই শুধু সহায়তা পায়। আমরা বঞ্চিত। ঘরে চাল না থাকলে নদীতে না নেমে উপায় থাকে না। শুনলাম সরকার ২৫ কেজি চাল দিচ্ছে । কিন্তু এই সামান্য চাল দিয়ে কয়দিন সংসার চলে? আর শুধু চাল দিয়ে ভাত রান্না করে তো খাওয়া যায় না। আনুষঙ্গিক অনেক বাজার-সদাই লাগে। তার ওপর আবার মহাজনের চাপ, নদীতে তেমন ইলিশ পাওয়া যায় না। তাই বাধ্য হয়ে মাছ ধরতে হচ্ছে।

গতবছর মা ইলিশ শিকারে এসে আটক হয়েছিলেন জেলে মাহবুব ঢালী । ১০ দিন জেলে থাকার পরে ৩০ হাজার টাকা খরচ করে তাকে জেল থেকে ছাড়িয়ে এনেছেন মহাজন গফুর বেপারি। এবার মাহবুব মাছ শিকারে এসেছেন। মঙ্গলবার বিকেলে উপজেলার মরিচা কান্দি এলাকায় কথা হয় তার সাথে। তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় কেউ খোঁজ নেয় না। গতবছর পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে ১০ দিন জেলে ছিলাম। মহাজন ৩০ হাজার টাকা খরচ করে ছাড়িয়ে এনেছে সেই টাকা এখনো শোধ করতে পারি নি। তাছাড়া আমাদের পুলিশ ধরলে মহাজনরা ছাড়িয়ে নিয়ে আসে এবং পরে মাছ ধরে সেই টাকা পরিশোধ করে দেই।

উপজেলার কাঁচিকাটা এলাকায় ৩০ বছর ধরে আড়তদারি করছেন রতন প্রধানীয়া। তিনি বলেন, কিছু অসাধু আড়তদার আছে তারা জেলেদের জিম্মি করে অভিযানের সময় নদীতে মাছ ধরতে পাঠায়। তাদের সাথে স্থানীয় প্রশাসন যোগ-সাজশে নদীতে মাছ ধরাচ্ছেন। কেউ ধরা পড়লে সাথে সাথেই টাকার বিনিময়ে ছাড়িয়ে রাখতে তারা। কেউ জেলে গেলে তাদের মোটা অংকের টাকা খরচ করে ছাড়িয়ে আনেন। এরপর টাকার জন্য চাপ দিয়ে নিষিদ্ধ সময়ে মাছ শিকারে বাধ্য করেন। আমরা সরকারের আইন মেনে নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা বন্ধ রেখেছি। অভিযান শেষে আমাদের জেলেরা ফের মাছ ধরা শুরু করবে। এ সময় তাদের খরচ জোগাতে অন্য কাজের পাশাপাশি আমরা কিছু টাকা দাদন দিচ্ছি।

তারাবুনিয়ার জেলে রফিক মোল্লা বলেন, “সরকার মাছ ধরতে মানা করেছে, কিন্তু পেট তো মানে না। মহাজন দাদন দিছে ৫০ হাজার। এখন টাকা শোধ করার জন্য প্রতিনিয়ত চাপ দিচ্ছে। মহাজন বলছে টাকা না দিলে আবার মামলা দিবে। তাই বাধ্য হয়েই নদীতে মাছ ধরতে যাই। মহাজন বলেছে, প্রশাসনিক যেকোনো ঝামেলা তিনি বহন করবে। কাউকে ধরে নিয়ে গেলে তিনি ছাড়িয়ে আনবেন।

উত্তর তারাবুনিয়া ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আক্তার আসামী বলেন, মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞার সময় সরকার জেলেদের জন্য ভিজিএফ চাল দেয়। কিন্তু অনেকেই বঞ্চিত হচ্ছেন ওই সহায়তা থেকে। ফলে জেলেদের অসহায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি প্রকৃত জেলেদের তালিকা তৈরি করে তাদের খাদ্য সহয়তা দেওয়ার। তাছাড়া তাদের বড় সমস্যা হচ্ছে দাদন ও এনজিও কিস্তির টাকা জন্য চাপ দেওয়া এই জন্যও জেলের নদীতে মাছ শিকারে নামে। আমি সরকারের কাছে দাবি করছি এই অভিযানের দিন গুলো জেনো কিস্তি নেওয়া বন্ধ থাকে।

স্থানীয় নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক একাধিক এনজিও কর্মী জানান, আমরা যখন জেলেদের ঋণ দেই সেখানে কোথাও অভিযানে কিস্তি দেওয়া বন্ধ থাকবে সে বিষয়ে উল্লেখ করা নেই। আমাদের এরিয়া ম্যানেজার আমাদেরকে প্রতিনিয়ত গ্রাহকের কাছ থেকে কিস্তির টাকা উঠানোর জন্য চাপ প্রয়োগ করে। তাই বাধ্য হয়ে আমরাও গ্রাহকদের চাপ প্রয়োগ করি।

ভেদরগঞ্জ উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো: আব্দুল্লাহ আল ইমরান বলেন, “আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। তবুও কিছু জেলে জীবিকার তাগিদে নদীতে নামছে। দাদন দেওয়ার বিষয়টি আমাদের জানা নেই। তবে এনজিও বিষয়ে স্থানীয় এনজিও কর্মীর সঙ্গে মত বিনিময় সভার মাধ্যমে এই ২২ দিন কিস্তি নেওয়া বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। এছাড়াও তাদের সহায়তার জন্য অতিরিক্ত ভিজিএফ বরাদ্দের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে এ বিষয়ে আলোচনা করা হচ্ছে।

Facebook Comments Box