শনিবার, ১০ই ডিসেম্বর, ২০২২ ইং, ২৫শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১৫ই জমাদিউল-আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরী
শনিবার, ১০ই ডিসেম্বর, ২০২২ ইং

নড়িয়ার চান্দনী গ্রামে আইনের সুশাসন নেই, ২৫টি পরিবার ঘরশূণ্য, মালামাল লুটপাট

নড়িয়ার চান্দনী গ্রামে আইনের সুশাসন নেই, ২৫টি পরিবার ঘরশূণ্য, মালামাল লুটপাট

শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলায় মিন্টু ছৈয়াল (২৫) বাহিনীর ভয়ে প্রায় ১০ মাস যাবত ২৫টি পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র বসবাস করছেন। এ সুযোগ ব্যবহার করে ঐ সব বাড়িঘরের মালামাল (নগদ টাকা, আসবাবপত্র, গরু-বাছুর, পুকুরের মাছ, দরজা, জানালা, ঘরের বেড়া) লুটসহ গাছপালা কেটে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। উপজেলার ভোজেশ্বর ইউনিয়নের চান্দনী গ্রামে এমন ঘটনা ঘটেছে।
মিন্টু ছৈয়াল বাহিনীর ভয়ে ২৫টি পরিবারের সদস্যরা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। পাশাপাশি পরিবারগুলোর ছেলে-মেয়েদের লেখাপাড়া ব্যাহত হচ্ছে। অভিযুক্ত মিন্টু ছৈয়াল একই গ্রামের মৃত ইয়াকুব ছৈয়ালের ছেলে।
এ ঘটনায় নিরাপত্তা চেয়ে শরীয়তপুর পুলিশ সুপারের (এসপি) কাছে বিষয়টি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
গ্রামবাসী ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো জানায়, নড়িয়া উপজেলায় ভোজেশ্বর ইউনিয়নের চান্দনী গ্রামের আরশেদ আলী ছৈয়ালের ছেলে ইয়াকুব ছৈয়াল (৫৫) ২০১৯ সালের ১০ জুন সকাল পৌনে ৯টার দিকে মোটরসাইকেল নিয়ে নিজ বাড়ি থেকে কলাবাগান যাওয়ার সময় চান্দনী আবু সিদ্দিক ঢালীর বাড়ির সামনের পাকা সড়কে পৌঁছলে দুর্বৃত্তরা পথ গতিরোধ করে বোমা নিক্ষেপ করে ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে ইয়াকুব ছৈয়ালকে। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা ইয়াকুবকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে অবস্থার অবনতি দেখে কর্তব্যরত চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা প্রেরণ করে। ঢাকা নেয়ার সময় ইয়াকুবের মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় ভোজেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আলী আহম্মদ শিকদারকে প্রধান আসামী করে ও তার পরিবারের ১৪ জনসহ ২২জনকে আসামী করে ১১ জুন নড়িয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। মামলার বাদী ইয়াকুব ছৈয়ালের ছেলে মিন্টু ছৈয়াল (৩৩)।
ইয়াকুব হত্যার পর জুয়েল খান, আউয়াল মুন্সী, রিয়াজুল ছৈয়াল, শহিদুল ছৈয়াল, রুবেল মুন্সী, মোহাম্মদ আলী ছৈয়াল, নজু ছৈয়াল, রাব্বি বেপারীসহ ২৫/৩০ নিয়ে বাহিনী বানিয়েছেন মিন্টু ছৈয়াল। এই বাহিনীর ভয়ে আট মাস যাবত অন্যত্র বসবাস করছেন চান্দনী গ্রামের নিরহ প্রায় ২৫ টি পরিবার। যারা ইয়াকুব হত্যা মামলায় জড়িত নয়। ওই নিরহ লোকজনের ওপর হামলা, বাড়িঘর লুটপাট-পুড়িয়ে দেয়া ও মারধরসহ বিভিন্ন ধরনের হুমকি দিচ্ছে মিন্টুর বাহিনী।
স্থানীয় সূত্র জানায়, নানা ধরনের অপকর্মের জন্য বাহিনী গঠন করেছেন মিন্টু ছৈয়াল। মিন্টুর বিভিন্ন অপকর্মে কেউ বাঁধা দিলে কিংবা থানা পুলিশকে জানালে নেমে আসে নির্যাতন। মিন্টুর ও তার বাহিনীর ভয়ে চান্দনি গ্রামের অলিম উদ্দিন ঢালী, খলিল ঢালী, জলিল ঢালী, লাল মিয়া ঢালী, মতলেব ঢালী, কাদের ঢালী, জামাল ঢালী, জাকির ঢালী, আবুল বাসার ঢালী, আলী আকবর ঢালী, মাওলানা আব্দুল মালেক, হাফেজ সানাউল্লাহ্, আবুল কাশেম ঢালীসহ ২৫টি পরিবারের প্রায় ১৫০ জন মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। মিন্টু ছৈয়াল বাহিনীর ভয়ে পরিবারগুলোর ছেলে-মেয়েদের লেখাপাড়া ব্যাহত হচ্ছে। এ নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন এলাকাবাসী।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য নাদিয়া জানায়, সে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। মিন্টুদের ভয়ে কয়েক মাস যাবত সে ও তার বাবা-মা, ভাই-বোন বাড়িতে আসতে পারে না। সে স্কুলে যেতে পারে না। তারা অন্যত্র ভাড়া বাসায় থাকে। তার লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার পথে।
ভুক্তভোগী অলিম উদ্দিন ঢালী বলেন, আমাদের গ্রামে একটি হত্যার ঘটনা ঘটে। কে বা কারা হত্যা করেছে তাও জানি না। আমরা ওই হত্যার মামলার আসামীও না। কিন্তু ঘটনার পর মিন্টু ছৈয়াল বাহিনীর ভয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। বর্তমানে আমাদের চান্দনী গ্রামে আইনের সুশাসন নেই। দশ মাস যাবত নিজ গ্রাম ছেড়ে পরিবার নিয়ে শশুর বাড়ি নড়িয়া ডিঙ্গামানিক গ্রামে থাকি। কত দিন অন্যের বাড়িতে থাকা যায়? পরিবার নিয়ে বাড়িতে এসে যেন নিরাপদে থাকতে পারি, তাই পুলিশ প্রশাসনের সাহায্য চাই।
গ্রামবাসী জানায়, হামলা, লুটপাট, মাদক ও বিভিন্ন অপকর্ম করে মিন্টু ছৈয়াল বাহিনীর লোকজন। বাহিনীর ভয়ে কেউ কোনো কথা বলে না। তাদের ভয়ে নিরহ লোকগুলো বাড়ি ছাড়া। আমরা তার বিচার চাই। বাহিনীর লোকজনকে আইনের আওতায় আনলে এই গ্রামের মানুষ শান্তি পাবে।
ভোজেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আলী আহম্মদ শিকদারের ছেলে শহীদুল ইসলাম শিকদার বলেন, ২০১৯ সালের ১০ জুন চান্দনী গ্রামে একটি সংঘর্ষ হয়। সেই সংঘর্ষে ইয়াকুব ছৈয়াল নামে এক ব্যাক্তির মৃত্যু হয়। সেই ঘটনায় আমিসহ আমাদের পরিবারের ১৪ জনসহ ২২জনকে আসামী করে একটি মিথ্যা মামলা হয়। সেই মিথ্যা মামলায় পাঁচ মাস জেল খেঁটেছি। মামলার আসামী সবাই জামিনে আছি।
সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে চান্দনী গ্রামের নিরহ ২৫টি পরিবারকে গ্রাম ছাড়া করেছে মিন্টু ও তার বাহিনী। যারা মামলার আসামী নয়। ওই বাহিনীর ভয়ে গ্রামে ফিরতে পারছে না পরিবারগুলো। গ্রামছাড়া পরিবারগুলো যাতে বাড়ি ফিরতে পারে তার ব্যবস্থা করার জন্য পুলিশকে অনুরোধ করেছি।
তিনি আরও বলেন, মিন্টু ছৈয়াল তার বাহিনীর লোকজন নিয়ে মাদক খায়, বিক্রিও করে। সাবেক মেম্বর সোরাফ হোসেন মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তাকে মারধরও করেছে। এ ঘটনায় থানায় একটি অভিযোগও হয়েছিল।
এ বিষয়ে মিন্টু ছৈয়াল মোবাইল ফোনে বলেন, আমার বিরুদ্ধে এগুলো মিথ্যা অভিযোগ করছে ওরা। তাদের বাড়িতে আসতে আমি না করার কে? আমি একজন ব্যবসায়ী। আমি কোন ঝামেলার ভিতরে যাই না।
ভোজেশ্বর ৬নং ওয়ার্ডের মেম্বার আমিনুল ইসলামকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে সবকিছু থেমে রয়েছে। ইয়াকুব ছৈয়ালের মার্ডার মামলার আসামী ইন্টার ঢালীরা কেউ বাড়িতে নেই। নড়িয়া থানার এসআই আজাদ ঐ সব বাড়িঘর দেখতে এসেছিল। বাড়িতে গিয়ে দেখলাম ঘরের বেড়াও, দরজা ও কপাট নেই। লোকজন বাড়িতে না থাকলে যা হয় আর কি! লুটপাট ও চুরি করে সবকিছু নিয়ে যাচ্ছে!
জানতে চাইলে নড়িয়া থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান মুঠোফোনে বলেন, করোনা আতঙ্কে আমরা ব্যস্ত আছি। তদন্ত চলছে, তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
শরীয়তপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (নড়িয়া সার্কেল) মিজানুর রহমানকে মুঠোফোনে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ফোন কেটে দিয়েছেন।


error: Content is protected !!