শুক্রবার, ১৯শে আগস্ট, ২০২২ ইং, ৪ঠা ভাদ্র, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২১শে মুহাররম, ১৪৪৪ হিজরী
শুক্রবার, ১৯শে আগস্ট, ২০২২ ইং

পদ্মার ভাঙ্গণে ৫ হাজার ৮১ পরিবার গৃহহীন

পদ্মার ভাঙ্গণে ৫ হাজার ৮১ পরিবার গৃহহীন

‘অামরা সাহায্য চাই না, বেরিবাধ চাই’ এখানে এখন বড় ছোট নেই সবাই সমান। বেরিবাধ থাকলে রিকশা বা ভ্যান চালাইয়া, মানুষ বাঁচতে পারতো। চোখের জল আর সব হারানোর দীর্ঘশ্বাস ফেলে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার পদ্মা নদী ভাঙ্গনের শিকার ২ সন্তানের জননী মাহামুদা বেগম একথা গুলো বলেন। তিনি এবার নিয়ে ৪ বার থাকার স্থান পরিবর্তন করে ওপরের কথা গুলো বলেন।

পদ্মা ভাঙ্গণের শিকার আজিজুল মাদবর বলেন, ৬ কি মি দুরে আমার বাড়ি আছিলো, ৪ বার আমার বাড়ি ভাঙছি, এবার নিয়ে ৪ বার ঘর ওঠাইছি। নদীর ভাঙ্গণে নিঃশেষ হইয়া গেলাম। প্রধান মন্ত্রী যদি তাকাইতো তাইলে রক্ষা অইবো, এছাড়া আমাগো রক্ষা করার কেউ নাই।

একই এলাকার জুয়েল ব্যাপারী বলেন, পদ্মায় ভাঙ্গণের স্থান থেকে মাত্র অর্ধ কি.মি. দুরে ৬ হাজার টাকার বিনিময় ২ শতাংশ জায়গা ভাড়া নিয়ে পরিবার নিয়ে কোন রকম বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি।

নজরুল ব্যপারী বলেন, ৪০ লাখ টাকা ব্যায়ে নির্মিত ইমারত খানি ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করে অন্যত্র জায়গা খুঁজতেছি।
মনির ব্যাপারী বলেন, ১৫ লাখ টাকায় নির্মিত ঘরখানী মাত্র ১৭ হাজার টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দিয়ে ১ কি.মি. দুরে কলুকাঠি আত্মীয়র বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি।

কেদারপুর গ্রামের সুফিয়া বেগম জানান, ২০ শতক জায়গার ওপর বড় বাড়ি ছিল। মূলফতগঞ্জ বাজারে দোকান ছিল স্বামী সোহেল মিয়ার। সবই কেড়ে নিয়েছে পদ্মা। দুই মাসের ব্যবধানে ভালো অবস্থান থেকে আজ আমরা ঠিকানাহীন হয়ে পড়েছি।

গত কয়েক মাস ধরে চলতে থাকা পদ্মার অব্যাহত ভাঙনে দিশেহারা হয়ে পড়েছে ভাঙ্গণ কবলিতরা। পুনর্বাসনের নেই কোন ব্যবস্থা। খোলা আকাশের নিচে খাওয়া দাওয়াও থাকা ভাঙ্গণ কবলিতদের।  প্রস্তুত রাখা হয়েছে আশ্রয়ণ কেন্দ্র হিসেবে ৩৯টি সাইক্লোন সেন্টার। হাসপাতালের সামনে দিয়ে পানি উন্নয়নবোর্ড থেকে বালু ভর্তি জিও টেক্সটাইল ব্যাগফেলার কাজ অব্যাহত রেখেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে ৫ কোটি টাকার বরাদ্ধকৃত জিও ব্যাগ ফেলানো হচ্ছে।

এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার সারাদিনেও কোন ক্ষয় ক্ষতির খবর না পাওয়া গেলেও ভাঙ্গণের অতঙ্কে রয়েছে পদ্মার পারের সকলেই। নড়িয়া এলাকার বাঁশতলা বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে ২’শ বসতঘর সরিয়ে নিচ্ছে ভাঙ্গণে আতঙ্ক পরিবারগুলো।

ভাঙ্গণ কবলিত ক্ষতিগ্রস্থরা বসত বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জিনিসপত্র সরিয়ে নিচ্ছে। বাজারগুলোর পাকা দোকানগুলো নিজেদের উদ্যোগে ভেঙ্গে ইট ও রড সড়িয়ে নিচ্ছে।

ভাঙ্গণ কবলিত মানুষ অভিযোগ করে বলেন, শুনেছি মন্ত্রী এমপিরা এসেছে। এসে আমাদের কোন খোঁজ খবর নিলনা। আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে গেলন না, এরা ভোটের সময় আসে তারপর তাদের দেখা যায়না। আমরা খাবার চাইনা, টাকা চাই না আমরা মাথা গোজানোর ঠাঁই চাই ও বেরিবাধ চাই।

এক সপ্তাহে সরকারি বে-সরকারি ভবন মূলফৎগঞ্জ বাজারের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বহু লোকের সাজানো গোছানো ঘরবাড়ী ভেঙেছে।  সোমবার রাতে নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নতুন ভবনটির অধিকাংশ নদীগর্ভে বিলীন হলেও এখনও বাকি অংশ একই অবস্থায় রয়েছে।  হাসপাতাল ক্যাম্পাসের একটি আবাসিক ভবনে জরুরী বিভাগ ও বহিঃবিভাগ চালু রাখা হলেও হাসপাতালে প্রবেশের সড়কটি বিলিন হয়ে যাওয়ার ভয়ে তেমন কোন রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসছে না। হাসপাতালের আরো ১১ টি ভবন ঝুঁকিতে রয়েছে। ফাটল দেখা দিয়েছে আরো একটি ভবন।

নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজিদা ইয়াসমিন বলেন, সরকারী হিসাব অনুযায়ী ৫ হাজার ৮১ টি পরিবার নদী ভাঙ্গণে আশ্রয়হীন হয়ে পরেছেন।  নদী ভাঙ্গণ ঠেকাতে ৫ কোটি টাকা ব্যায়ে ১ লক্ষ ১০ হাজার বস্তা জিও ব্যাগ ফলানো হচ্ছে। এতে করে পদ্মার শ্রোত কিছুটা কমেছে।

শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন, নদীর পানি না কমা পর্যন্ত তীর রক্ষা প্রকল্পের কাজ শুরু করা সম্ভব না। এ মুহূর্তে ভাঙণ রোধ সম্ভব না হলেও বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে তীব্রতা কমানোর চেষ্টা চলছে। পানি কমলেই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে।

জেলা প্রশাসন কাজী আবু তাহের বলেন, ইতিমধ্যে আশ্রয় কেন্দ্র ভাঙণ কবলিতদের আশ্রয়ের জন্য ৩৯ টি সাইক্লোন সেন্টার প্রস্তুত করা হয়েছে। ভাঙণ কবলিত সব ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা হিসেবে চাল ও শুকনা খাবার দেয়া হয়েছে। আর পূনর্বাসন সহায়তা হিসেবে টিন ও নগদ টাকা দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।


error: Content is protected !!