শরীয়তপুরের সখিপুরে আলোচিত শিশু তায়্যেবা হত্যাকাণ্ডে দায়ের করা মামলার বাদী নিহতের বাবা ও মা এখন নতুন আতঙ্কে। মামলা তুলে নিতে তাকে আসামিপক্ষ থেকে একের পর এক ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। সর্বশেষ তাঁকে বলা হয়েছে মামলা উঠাইয়া না নিলে তোর পোলারে খাইয়া ফালামু। তোর পোলারে শেষ দেখা দেইখা রাখিস। তোর মাইয়ার তো লাস পাইছো, পোলার লাস খুঁজে পাবি না। সোমবার সকালে শিশু তায়্যেবার বাড়ীতে গেলে তায়্যেবার মা ডলি আক্তার অভিযোগ করে এসব কথা বলেন।
শিশুটির পরিবার জানায়, গতকাল রবিবার সকালে নিহত তায়্যেবার মা ডলি আক্তারকে উদ্দেশ্য করে মামলার আসামি আয়েশা বেগমের ছেলে আকিব, ননদ রিনা ও রুমা তাদের বাড়ীতে এসে প্রকাশ্যে মামলা উঠিয়ে নিতে হুমকিধামকি দিয়ে যায়। এসময় আকিব ও রিনা নিহত শিশু তায়্যেবার মাকে হুমকি দিয়ে বলেন মামলায় আপোষ না হলে তার মেয়ে তায়্যেবার মতো তার ছেলেকে হত্যা করা হবে। এছাড়াও রাজনৈতিক পরিচয়ে তাকে আসামিপক্ষের সাথে মিমাংসা হয়ে যাওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেন নিহত তায়্যেবার মা ডলি আক্তার। এছাড়াও শিশু তায়্যেবা হত্যার বিচারের দাবীতে মানববন্ধনে অংশগ্রহন করা শিক্ষার্থীদের হুমকি দেওয়া হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত বুধবার ২৩ সেপ্টেম্বর বিকেলে উপজেলার সখিপুর ইউনিয়নের ছৈয়াল কান্দি এলাকায় ছয় বছরের শিশু তায়্যেবা বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়। অনেক খোঁজাখুঁজির দু’দিন পর শুক্রবার পাশের মেসবাহউদ্দীন মোল্লার নামে এক ব্যক্তির বাসার সেফটিক ট্যাংক থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার দিন শুক্রবার রাতে শিশু তায়্যেবার চাচি আয়েশা বেগম, প্রতিবেশী নাসিমা ও আসিফ নামে ৩ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় আনা হয়। পরে প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, পারিবারিক বিরোধ ও শত্রুতার জেরে আপন চাচিই তাঁকে হত্যা করেছেন। এ ঘটনায় নিহত শিশুর বাবা টিটু সরদার বাদী হয়ে সখিপুর থানায় মামলা দায়ের করেন। পুলিশ তদন্ত করে তায়্যেবার আপন চাচি সহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দও করেছে। তবে মামলার প্রক্রিয়া চলতে না চলতেই নতুন বিপদ নেমে আসে। আসামি পক্ষ থেকে বারবার চাপ দেওয়া হচ্ছে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য। রবিবার সকালে নিহত তায়্যেবার বাড়ীতে এসে হত্যায় জড়িত আয়েশা বেগমের স্বামী সাহান সরদার ছেলে আকিব সরদার ও ননদ রিনা ও রুমা তাদের প্রকাশ্যে মামলা উঠিয়ে নিতে হুমকিধামকি দিয়ে যায়। হুমকির পর থেকে পরিবারটি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
শিশুটির মা ডলি আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,“আমার মেয়েকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। এখন আমি ন্যায়বিচার চাই। কিন্তু উল্টো আমাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে মামলা না তুললে আমার আরেক সন্তানকেও খুন করবে। আমি দিনরাত আতঙ্কে আছি। আমি প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা চাই। গতকাল সকালে আয়েশা বেগমের স্বামী সাহান সরদার, ছেলে আকিব সরদার,রিনা ও রুমা এসে আমাদের মামলা উঠিয়ে নিতে হুমকিধামকি দিয়ে যায়। ওরা বলে মামলা না উঠালে আমার সন্তান অথবা স্বামীকে হত্যা করবে।
হত্যা মামলার বাদী শিশুটির বাবা টিটু সরদার বলেন, “আমরা এখন বাড়ি থেকে বের হতেও ভয় পাচ্ছেন। আমার ছেলে
স্কুলে যাওয়া ও বাড়ীর বাহিরে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। কে কখন কী করবে সেই ভয়ে আমরা কাঁপছি। বিচার চাইতে গিয়ে মনে হচ্ছে আরও বিপদ ডেকে আনলাম। ওরা প্রকাশ্যে যেভাবে হুমকি দিচ্ছে মনে হয় মামলায় আপোষ না হলে আমাদের মেরে ফেলবে। আমি আমার মরণ হলেও মেরে হত্যার বিচার চাই। আমি দেশবাসীর কাছে দোয়া ও নিরাপত্তা চাই।”
টিটু সরদারের প্রতিবেশী আবুল কাশেম মিয়া বলেন, “শিশুহত্যার মতো জঘন্য অপরাধের বিচার না হলে সমাজে ভয়ঙ্কর দৃষ্টান্ত তৈরি হবে। আর বাদীকে যদি এমন হুমকি দেওয়া হয় তাহলে কেউই আর মামলা করতে সাহস করবে না। প্রশাসনের উচিত দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলা তদন্ত করে হত্যার সাথে জড়িতদের গ্রেফতার করা। আমার মনে হচ্ছে এই হত্যাকাণ্ডের সাথে আরও কেউ জড়িত থাকতে পারে। একার পক্ষে এই হত্যা করা সম্ভব হয় নি। আয়েশা বেগমের স্বামী সাহান সরদার ও ছেলে আকিব সরদার ননদ রিনা ও রুমা কে আটক করলে এই হত্যাকাণ্ডের অনেক তথ্য পাওয়া যাবে। যেহেতু তারা মামলা উঠিয়ে নিতে চাপ প্রয়োগ ও হুমকি ধামকি দিচ্ছে আমি মনে করি তাদের আটক করা জরুরি।”
তায়্যেবা হত্যাকারীদের বিচারের দাবীতে মানববন্ধনে অংশ নেওয়া দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী লামিয়া বলেন, “আমি আমার স্কুলের শিক্ষার্থীদের সাথে মানববন্ধনে আসার পথে সাহান সরদার আমাকে বলে আমরা যদি মানববন্ধন করি তাহলে আমাদের লাস খুঁজে পাওয়া যাবে না। আয়েশা বেগমের ছেলে আমাদের মানববন্ধনের এখানে এসে সবার ভিডিও করে নিয়ে গেছে। ওরা বলছে কাউকে স্কুলে আসতে দিবে না। আমরা এগুলো ভয় পাই না। আমরা তায়্যেবা হত্যার বিচার চাই।”
এ বিষয়ে সখিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওবায়দুল হক বলেন,”শিশু তায়্যেবা হত্যার ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ তিনজন সন্দেহভাজন আসামি নিহতের চাচি আয়েশা বেগম, প্রতিবেশী নাসিমা ও আসিফকে গ্রেফতার করে আদালতে রিমান্ডের আবেদন করে। মহামান্য আদালত আয়েশা বেগমের দুইদিনের রিমান্ড মনজুর করে। এ ঘটনার সাথে জড়িত সকল আসামিকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার জন্য কাজ করছে পুলিশ। হুমকির বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাদী পরিবার লিখিত অভিযোগ দিলে পুলিশ তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নেবে। হুমকি দাতাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হবে। বাদীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা প্রস্তুত।




মন্তব্য করুন