মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিবছর বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশেও নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে ১৬ দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ (২৫ নভেম্বর – ১০ ডিসেম্বর) পালন করে থাকে। এবছর এ মন্ত্রণালয়, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহোযোগী সংস্থা পক্ষব্যাপী নারী নির্যাতন বন্ধ ও সচেতনতা সৃষ্টিতে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
এরই ধারাবাহিকতায় আজ ৫ ডিসেম্বর ২০২১ এসডিএস (শরীয়তপুর ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি) এর নেতৃত্বে শরীয়তপুর জেলায় অবস্থানরত বিভিন্ন বেসরকারী সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জাতীয় মহিলা সংস্থা এর সমন্বয়ে নারীনির্যাতন প্রতিরোধের পক্ষে এক মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

মানববন্ধন শেষে বিভিন্ন সংগঠন ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের স্বাক্ষরিত একটি স্মারকলিপি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে প্রেরণের জন্য শরীয়তপুর জেলার জেলা প্রশাসকের নিকট দাখিল করা হয়।
শরীয়তপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয় প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এই মানববন্ধন, নারী নির্যাতন প্রতিরোধের পক্ষে বিভিন্ন স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে।
এবছরের প্রতিপাদ্য ছিল “Orange the World: END VIOLENCE AGAINST THE WOMEN NOW’’
বাংলায়: ’’কমলা রঙ্গের বিশ্ব গড়ি: নারী নির্যাতন বন্ধ করি’’
স্লোগানের পাশাপাশি উপস্থিত বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ নারী নির্যাতনের বিপক্ষে তাদের নিজনিজ মতামত ব্যক্ত করেন।
শরীয়তপুর কালেক্টরেট পাবলিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্র এবং কিশোর-কিশোরী ও যুব ক্লাবের সভাপতি মোঃ আব্দুল্লাহ জামিল তার বক্তব্যে বলেন ‘’ আমি একজন ছেলে, আমার বোন আছে। আমি যদি কোন মেয়েকে দেখে অনুভব করি সেও আমার মত কোন ছেলের বোন। আমার বোন আমার কাছে যেমন আদরের, সেও তার ভাইয়ের কাছে তেমনী আদরের। তবেই ছেলেমেয়েদের প্রতি পারষ্পরিক শ্রদ্ধাবোধ আসবে।’’
পালং উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্রী এবং খেলশি কিশোরী ক্লাবেব সভাপতি মোসাম্মৎ নিসা আক্তার তার বক্তবে বলে, বাংলাদশের বর্তমান নারীনির্যাতন পরিস্থিতি দেখলে এখনও গা শিউরে ওঠে। যখন পত্রপত্রিকায় মাধ্যমে জানতে পারি মাত্র পাঁচ বছরের শিশুকে ধর্ষণের পরে তার উপরে পাশবিক নির্যাতন করা হয়েছে তখন এই সমাজের প্রতি ঘৃণা ধরে যায়।
এসডিএস এর উপ-পরিচালক (মানব সম্পদ) এবং জেন্ডার ফোকাল অমলা দাস তার অতিসংক্ষিপ্ত বক্তব্যে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ (২৫ নভেম্বর ও ১০ ডিসেম্বর) সম্পর্কে সকলকে ধারনা প্রদান করেন।
তিনি জানান, আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস আজ (২৫ নভেম্বর)। বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে দিবসটি। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘নারী নির্যাতন বন্ধ করি, কমলা রঙের বিশ্ব গড়ি’। নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে ১৯৮১ সালে লাতিন আমেরিকায় নারীদের এক সম্মেলনে ২৫ নভেম্বর আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। ১৯৯৩ সালে ভিয়েনায় বিশ্ব মানবাধিকার সম্মেলন দিবসটি স্বীকৃতি পায়। জাতিসংঘ দিবসটি পালনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় ১৯৯৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর। বাংলাদেশ ১৯৯৭ সাল থেকে দিবসটি পালন করে আসছে।
এসডিএস এর নির্বাহী পরিচালক এবং শরীয়তপুর জেলা নির্বাচিত ‘জয়িতা’ রাবেয়া বেগম তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, অতীতকাল থেকে আজ অবধি সমাজের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বাধা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণ, নির্যাতন ও বৈষম্য ছাড়াও অগনতি প্রতিবন্ধকতা মেয়েদের পায়ে শিকল পড়িয়ে রাখছে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শহর-গ্রামভেদে কিছু ভিন্নতা বা নিপীড়নের গুরু-লঘু ভেদ ঘটলেও নারীর শৃঙ্খলিত জীবনের কাহিনি সর্বত্রই প্রায় এক।
তিনি শরীয়তপুর জেলায় নারী আন্দোলনের কিছু সফলতার কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে একটি ব্যাপক আলোচিত ঘটনার উল্লেখ করেন। ২০১৯ সালের ২৯শে জুন শরীয়তপুর জেলার জনৈক প্রভাবশালী ব্যক্তির ছেলে একজন কলেজ শিক্ষার্থীকে বাড়ি ডেকে নিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে । পরে ৩০শে জুন ধর্ষণকারী ও তার সহযোগীদের বিরেুদ্ধে থানায় মামালা হয়। পুলিশ আসামীদেরকে আটক করেন কিন্ত আটকের ৬ দিনের মাথায় তারা জামিনে বেরিয়ে আসায় আন্দোলনে নামে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন। পরবর্তীতে তাদের জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠিয়েছিল আদালত। পরবর্তীতে গত ২৪ নভেম্বর ২০২১ শরীয়তপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক উক্ত আসামীকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন।
তিনি শরীয়তপুর জেলার নারী আন্দোলনের পক্ষ হতে এই ন্যয়বিচারকে সাধুবাদ জানান পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেন; শুধু অপরাধের বিচার হলেই নারীউন্নয়ন সম্ভব নয়, অপরাধ নির্মূল করাই আমাদের লক্ষ হতে হবে। নারীদের প্রতি সহিংসতা প্রশমনে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র সকলকে এক যোগে কাজ করতে হবে। সামাজিক আন্দোলন আরও বেগবান করতে হবে। তবেই এক সময় নারীর প্রতি সহিংসতা নির্মূল হতে পারে।
উক্ত অনুষ্ঠানে শরীয়তপুর জেলা মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান, নারী নেতৃ ও মানবাধিকার কর্মী এ্যাডভোকেট রওশনারা বলেন; আমাদের দেশে রাস্তাঘাটে এখনও মেয়েরা নিরাপদ নয়। আমরা যতি আমাদের ছেলেদেরকে পারিবারিক সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারি তা হলেই এই সংকট একসময় উত্তোরন সম্ভব হবে।
উক্ত মানববন্ধন কর্মসূচীর সার্বিক সহযোগিতায় ছিল; দূর্বার নেটওয়ার্ক নারীপক্ষ এবং আমরাই পারি প্রচারাভিযান।
#

মন্তব্য করুন