বৃহস্পতিবার, ৬ই মে, ২০২১ ইং, ২৩শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৪শে রমজান, ১৪৪২ হিজরী
বৃহস্পতিবার, ৬ই মে, ২০২১ ইং

নড়িয়ায় মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়মের অভিযোগ

নড়িয়ায় মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়মের অভিযোগ

শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অফিসে অনুপস্থিত থাকা ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ উঠেছে, বেতন-ভাতা, সরকারি সভা, সেমিনার থাকলে অফিসে উপস্থিত থাকেন তিনি। বাকি সময় অনুপস্থিত। কিশোর-কিশোরী ক্লাবের ফিল্ড সুপার ভাইজার ও জেন্ডার প্রমোটরদের বেতন না দিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, মহিলাদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প সমিতিতে ভূয়া নাম দেখিয়ে অনুদানের অর্থ আত্মসাৎ ও ইউনিয়ন পরিষদের ভিজিডি পরিবহন বিল না দিয়ে মোটা অংকের অর্থ আত্মসাৎ করা অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া দফরের বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের সহায়তা দিতেও অর্থ আদায় করছেন নড়িয়া উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা রুজিনা খানম। তবে সব অভিযোগই ভিত্তিহীন দাবি ওই কর্মকর্তার।

নড়িয়া ও জাজিরা উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা অফিস ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের ৪ মে নড়িয়া উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন রুজিনা খানম। এছাড়া ২০১৫ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জাজিরা উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা অতিরিক্ত দায়িত্বে ছিলেন তিনি। গত ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অফিসে অনুপস্থিত ছিলেন নড়িয়া উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা রুজিনা খানম। এছাড়া ২০১৬ সাল থেকে বেতন-ভাতা, সরকারি সভা, সেমিনার থাকলে অফিসে উপস্থিত থাকেন তিনি। বাকি সময় গাজীপুর নিজ বাড়িতে আরাম আয়েশে কাটান তিনি।

জাজিরায় দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তিনটি স্বেচ্ছাসেবী মহিলা সমিতি নামে ৬০ হাজার অনুদান আসে। কিন্তু সেই অনুদানের টাকা তুলে আত্মসাৎ করেন তিনি। এ ঘটনায় ২০২০ সালের ১০ নভেম্বর জাজিরার হরিয়াশা নারী বিকাশ কেন্দ্রের সভানেত্রী নাসিমা বেগমসহ আরও দুইজনে তৎকালীন ইউএনও বরাবর তিনটি অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগ সত্য প্রমানিত হলে সেই টাকা ফিরত দেন রুজিনা খানম। এছাড়া ২০১৫ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত জাজিরার ১২ টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের ভিজিডি পরিবহন বিল না দিয়ে মোটা অংকের অর্থ আত্মসাৎ করছেন তিনি।

এ বিষয়ে জাজিরা উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মো. আফজাল হোসেন বলেন, স্বেচ্ছাসেবী মহিলা সমিতি, যা জেলা অফিস থেকে রেজিস্ট্রেশনভুক্ত। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ওই সমিতির তিনজনের নামে ৬০ হাজার টাকা অনুদান আসে। তখনকার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুজিনা খানম ওই টাকা বিতরণ করেন নাই। পরে জাজিরার হরিয়াশা নারী বিকাশ কেন্দ্রের সভানেত্রী নাসিমা বেগমসহ তিনজনে জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা এবং ইউএনওসহ বিভিন্ন যায়গায় অভিযোগ করলে, আমাকে তদন্তর জন্য বলে। অভিযোগ সত্য প্রমানিত হলে টাকা ফেরত দেন রুজিনা খানম। এছাড়া রুজিনা খানম জাজিরা থাকাকালীন আড়াই বছরের ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের ভিজিডি পরিবহন বিল তিন লাখ টাকা না দিয়ে নিজে স্বাক্ষর করে ব্যাংক হিসাবে জমা না দিয়ে, তিনি নিজে নিয়ে গেছেন। এ বিষয়ে চেয়ারম্যানগণ জাজিরা ইউএনও মহোদয় ও আমার কাছে অভিযোগ করেন। আমরা টাকাটা উদ্ধারে কাজ করছি।

নড়িয়া উপজেলার নবগ্রাম এলাকার বাবুল গাইনের স্ত্রী সুমী আক্তার (৪৫) বলেন, ভিজিডি কার্ডের জন্য আমার এনআইডি কার্ডসহ অন্যন্য কাগজপত্র জমা নেন নড়িয়া উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা রুজিনা খানম। আমার বিজিডি কার্ডতো হয়ই নাই। পরে শুনি মহিলাদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প সমিতিতে আমার নামে ঋণ নেয়া হয়েছে। যা আমিই জানিনা। ওই ঋণ খেলাপীর জন্য আমার কাছে নোটিশ আসতে থাকে। জানতে পেরে মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা অফিসে যাই প্রতিবাদ করি। এ বিষয়টি তখনকার ইউএনওকে জানাই। পরে মূলফৎগঞ্জ পূর্ব নড়িয়া গ্রামের স্বামী রিপন ব্যাপারী নামে ভূয়া ঠিকানায় রুজিনা খানমের নিজের নামে একটি বই তৈরি করে আমাকে ১৫ হাজার টাকা ঋণ দেন মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা। যার কিস্তি চালিয়ে যাচ্ছি। একই অবস্থা করেছেন তিনি আমার ননদ ফরিদা বেগমের (৭০) সঙ্গে।
একই গ্রামের নাসিমা বেগম (৪০) জানান, ২০১১ সালে তার স্বামী ইউসুফ সরদার দুই মেয়ে, এক ছেলেকে রেখে দুবাই যায়। সেখানে নিখোঁজ হন ইউসুফ। নাসিমার সংসারে অভাব। তাই ভিজিডি কার্ড দেবে বলে ২০১৯ সালের মার্চে এনআইডি কার্ড নিয়েছে রুজিনা ম্যাডাম। পরে তিনি জানতে পারেন তার স্বাক্ষর জাল করে ১৫ হাজার টাকা ঋণ তুলেছেন রুজিনা ম্যাডাম। একই অবস্থা তার মেয়ে নিশু আক্তারের (২১)। নিশু জানান, (সেলাই মেশিন) ট্রেলারি কাজ শিখবে বলে আইডি কার্ড জমা দেন রুজিনা ম্যাডামের কাছে। তার স্বাক্ষর জাল করেও ১৫ হাজার টাকা ঋণ তুলেছেন রুজিনা। এরকম অন্তত ২০ জনের স্বাক্ষর জাল করে ঋণ তুলে টাকা আত্মসাৎ করেছেন ওই কর্মকর্তা।

নড়িয়া বৈশাখিপাড়া গ্রামের টুম্পা আক্তার (২৫) বলেন, ২০১৯ সালে কিশোর-কিশোরী ক্লাবের জেন্ডার প্রমোটর হিসেবে চাকরি করছি। চাকরি পেতে রুজিনা খানমকে ২ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। ৫৬নং কেদারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আবৃত্তি শিক্ষক আমি। প্রতি শনিবার ক্লাস করাতে হয়। মাসে ২ হাজার টাকা বেতন। কিন্তু তিন বছর চাকরির বয়স মাত্র চার মাসের বেতন দিছে ম্যাডাম। আর সব আত্মসাৎ করেছে। চার মাসের বেতন উঠাতে কয়েকজোড়া জুতা ক্ষয় হয়েছে। শিলংকর গ্রামের তানিয়া ও দক্ষিণ নড়িয়ার রানী দাস সংগীত শিক্ষক তাদের অবস্থা টুম্পার মতই।

নড়িয়া উপজেলার ভূমখাড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ডি.এম শাহজাহান সিরাজ বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে গর্ভবতি মায়েদের তিনদিন প্রশিক্ষণ দেয় মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার অফিস থেকে। তিনদিনে প্রতিজনকে ১৫০টাকা করে দেয়ার কথা। আমার ইউনিয়নে পাঁচ বছরে একবার প্রশিক্ষণ করানো হয়েছে। যেখানে ৭৯জন প্রশিক্ষণ দেয়। মাত্র ৬ জনকে টাকা দেয়া হয়েছে। বাকি টাকা আত্মসাৎ করেছে মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, তিন বছরের ইউনিয়ন পরিষদের ভিজিডি পরিবহন বিল ৩ লাখ টাকা আমাদের দেননি মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা রুজিনা খানম। টাকাটা আত্মসাৎ করছেন তিনি।

নড়িয়া উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা রুজিনা খানম অনিয়মের বিষয় অস্বীকার করে বলেন, গত ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমি অসুস্থ ছিলাম। ইউএনও ও জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তাকে মৌখিকভাবে বলে ছুটি নিয়েছিলাম। আমি সব সময় অফিস করি। অনিয়ম করি না। কোন টাকা আত্মসাৎ করিনি। সব সঠিকভাবে কাগজপত্রে উল্লেখ আছে।

জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা তাছলিমা আক্তার বলেন, মাত্র দুই মাস হলো জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছি। বিষয়গুলো মাত্র জানলাম। বিষয়গুলো নিয়ে কেউ যদি আমার কাছে অভিযোগ নিয়ে আসে, তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জয়ন্তী রূপা রায় বলেন, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার বিষয়গুলো আমরা ক্ষতিয়ে দেখবো। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তাছাড়া গত ফেব্রুয়ারিতে ছুটির জন্য আমার কাছে লিখিত কোন দরখাস্ত দেননি ওই কর্মকর্তা।