ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। এই মাছ শুধু আমাদের খাদ্য সংস্কৃতির অংশ নয়, বরং অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও পুষ্টির ভারসাম্য রক্ষায়ও এর গুরুত্ব অপরিসীম। দেশের নদ-নদীতে ইলিশের প্রাচুর্য একদিকে যেমন লাখো জেলের জীবিকা নিশ্চিত করে, অন্যদিকে রপ্তানি আয়ে বড় অবদান রাখে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রজনন মৌসুমে নির্বিচারে মা ইলিশ ধরা, অবৈধ জাল ব্যবহার ও আইন অমান্যকারীদের দৌরাত্ম্যের কারণে এ সম্পদ দিন দিন হুমকির মুখে পড়ছে। তাই মা ইলিশ রক্ষায় প্রশাসনের কঠোর ভূমিকা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি শরীয়তপুর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান-২০২৫ বাস্তবায়ন বিষয়ক টাস্কফোর্স সভায় জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম এবং পুলিশ সুপার নজরুল ইসলাম যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম সভায় স্পষ্টভাবে বলেছেন, “ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ। দেশের অর্থনীতি ও পুষ্টির ভারসাম্য রক্ষায় এর গুরুত্ব অপরিসীম। তাই ইলিশ রক্ষায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।” এই বক্তব্য ইঙ্গিত করে যে, শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়—জনসাধারণের অংশগ্রহণ ছাড়া মা ইলিশ রক্ষা সম্ভব নয়।
অন্যদিকে পুলিশ সুপার নজরুল ইসলাম সভায় ঘোষণা দিয়েছেন, “মা ইলিশ রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থানে থাকবে এবং অভিযানে কোনো ধরনের গাফিলতি সহ্য করা হবে না।” পুলিশের এই অবস্থান অত্যন্ত ইতিবাচক। কারণ বাস্তবে দেখা যায়, নিষিদ্ধ মৌসুমে কিছু অসাধু জেলে ও ব্যবসায়ী সুযোগ বুঝে নদীতে অবাধে মা ইলিশ শিকার করে থাকে। এতে শুধু মাছের প্রজনন বাধাগ্রস্ত হয় না, ভবিষ্যৎ প্রজন্মও বঞ্চিত হয়। পুলিশের কঠোর নজরদারি ও নদীতে নিয়মিত টহল অভিযান এ ধরনের অপরাধ দমন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে এখানে আরও একটি দিক বিবেচনা করা জরুরি। মা ইলিশ ধরা বন্ধ থাকলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দরিদ্র জেলে পরিবারগুলো। তাদের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সভায় এ বিষয়টি আলোচনায় এসেছে, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। সরকারের পক্ষ থেকে ভিজিএফ সহায়তা, খাদ্য বিতরণ বা ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করলে জেলেরা অবৈধভাবে মাছ ধরতে নিরুৎসাহিত হবে।
মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানকে সফল করতে হলে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। জেলেদের বোঝাতে হবে, আজ যদি মা ইলিশ ধরা থেকে বিরত থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে নদীতে ইলিশের প্রাচুর্য ফিরবে এবং তাদের আয়ও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। প্রশাসনের প্রচারণা কার্যক্রমে বিদ্যালয়, কলেজ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে দ্রুত সচেতনতা ছড়িয়ে পড়বে।
এছাড়া বাজার ও পরিবহন ব্যবস্থায় নজরদারি জোরদার করাও জরুরি। অনেক সময় নদী থেকে ধরা নিষিদ্ধ ইলিশ গোপনে বাজারে প্রবেশ করে। তাই কেবল নদীতে অভিযান চালিয়ে নয়, বাজার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেও এ অপরাধ রোধ করতে হবে। জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের ঘোষণার মাধ্যমে বোঝা যায়, তারা সমন্বিতভাবে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
ইলিশ বাংলাদেশের গর্ব। বিশ্বের মোট ইলিশের প্রায় ৮০ শতাংশই উৎপাদিত হয় এই দেশে। তাই এ সম্পদ সংরক্ষণ শুধু অর্থনীতির জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও অপরিহার্য। শরীয়তপুরের টাস্কফোর্স সভায় প্রশাসন ও পুলিশের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ইঙ্গিত করে যে, এ অভিযানে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই।
আমরা মনে করি, জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম ও পুলিশ সুপার নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে শরীয়তপুরে মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান-২০২৫ আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে। তবে শুধু শরীয়তপুর নয়, দেশের সব ইলিশ উৎপাদনকারী জেলাগুলোতে একইভাবে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। জাতীয় স্বার্থে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জনপ্রতিনিধি, জেলে ও সাধারণ জনগণ—সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তাহলেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা টেকসই ইলিশ সম্পদ নিশ্চিত করতে পারব।
লেখক: শহীদুল ইসলাম পাইলট, সম্পাদক ও কলাম লেখক।

মন্তব্য করুন