নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি (নওপাজেকো)-এর বিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানের আওতায় থাকা এক কর্মকর্তাকে উত্তরবঙ্গের প্রধান বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (নেসকো)-এর সর্বোচ্চ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিতর্কিত সাবেক প্রকল্প পরিচালক (পিডি) প্রকৌশলী মশিউর রহমানকে নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর সংস্থাটিতে চরম প্রশাসনিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

কর্মস্থলে নিয়মিত অনুপস্থিতি, ঢাকার লিয়াজোঁ অফিস থেকে বিতর্কিতভাবে সংস্থার কার্যক্রম পরিচালনা এবং পুরোনো সিন্ডিকেটের সদস্যদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে তিনি বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

১৬ জেলার ২২ লাখ গ্রাহক চরম দুর্ভোগে

নেসকো বর্তমানে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬টি জেলার প্রায় ২২ লাখ গ্রাহককে ৬০টি বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ এবং ইলেকট্রিক সাপ্লাই ইউনিটের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সেবা দিয়ে থাকে। তবে বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও অদক্ষতার অভিযোগের কারণে জরুরি এই সেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

খুলনার দুই প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

নওপাজেকোর সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক খোরশেদ আলমের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত মশিউর রহমান আগে খুলনার দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন। প্রকল্প দুটি হলো খুলনা ২২৫ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র।

অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প দুটিতে ইপিসি ঠিকাদার নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। কর্মকর্তাদের আপত্তি উপেক্ষা করে ঠিকাদারকে বেআইনি সুবিধা দেওয়া, প্রভাব খাটিয়ে সাবেক এমডির নিকটাত্মীয়দের উপঠিকাদার হিসেবে কাজ পাইয়ে দেওয়া, সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে সর্বোচ্চ দরদাতাকে কাজ দেওয়া এবং চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত আউটপুট না পেলেও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার মতো গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

দুদকের তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি

নওপাজেকোর এই দুটি প্রকল্পে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার লুটপাটের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক। সংস্থাটির পরিচালক মো. আবুল হাসনাতকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে চিঠি পাঠিয়ে নথিপত্র ও তথ্য-প্রমাণ তলব করেছে।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, “আলোচিত প্রকল্প দুটিতে ব্যাপক অনিয়মের স্পষ্ট অভিযোগ রয়েছে। সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি দুদকও বিষয়টির অনুসন্ধান করছে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো বিতর্কিত কর্মকর্তাকে সরকারের কোনো শীর্ষ পদে বসানোর সুযোগ নেই।”

তবে বিশেষজ্ঞের এই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেই মশিউর রহমানকে নেসকোর এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

রাজশাহীতে কার্যালয়, কার্যক্রম চলে ঢাকায়

নেসকোতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে নতুন এমডির বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম চার মাসে রাজশাহীর প্রধান কার্যালয়ে তিনি সশরীরে উপস্থিত ছিলেন মাত্র চার দিন।

রাজশাহীর প্রধান কার্যালয় ছেড়ে ঢাকার বিজয়নগরের লিয়াজোঁ অফিস থেকে তিনি কার্যক্রম পরিচালনা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সেখানেও দুপুর ১২টার আগে তিনি দপ্তরে আসেন না বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। এর ফলে মাঠপর্যায়ে জরুরি সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে এবং সমন্বয়হীনতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ ফাইলের কার্যক্রম আটকে থাকছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ভাতার অনিয়ম ও বিলাসিতার অভিযোগ

অভিযোগ রয়েছে, ঢাকায় প্রতি মাসে ১৫ থেকে ২০টি অপ্রয়োজনীয় বৈঠক ডেকে তিনি এবং কয়েকজন সুবিধাভোগী কর্মকর্তা মোটা অঙ্কের সিটিং অ্যালাউন্স নিচ্ছেন। পাশাপাশি, কর্মস্থল রাজশাহী হওয়া সত্ত্বেও ঢাকায় অবস্থান করে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে ভ্রমণ ও দৈনিক ভাতা (টিএ/ডিএ) নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

ঢাকা-রাজশাহী যাতায়াতে নিয়মিত সরকারি বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করার পরও একই ভ্রমণের বিপরীতে যাতায়াত ভাতা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ ছাড়া প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনাকাটায় দীর্ঘসূত্রতা, সাধারণ ঠিকাদারদের বকেয়া বিল আটকে রাখা এবং নির্দিষ্ট কিছু পছন্দের সিন্ডিকেটকে কাজ পাইয়ে দিতে গোপন আঁতাতের অভিযোগও রয়েছে।

পুরোনো সিন্ডিকেটের পুনর্বাসনের অভিযোগ

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৬ সাল থেকে নেসকোতে গড়ে ওঠা দলীয় সিন্ডিকেটের সাবেক এমডি জাকিউল ইসলামের অনুসারী এবং অডিট আপত্তি থাকা কয়েকজন শীর্ষ প্রকৌশলীকে সঙ্গে নিয়ে বর্তমান এমডি সংস্থাটি পরিচালনা করছেন। জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে পছন্দের বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়ার চেষ্টাও চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এমনকি বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী সভায় বর্তমান এমডির ঘুমিয়ে পড়ার মতো অপেশাদার আচরণের ছবি ও খবর কর্মীদের মধ্যে চরম অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে বলে জানা গেছে।

দ্রুত অপসারণের দাবি

বিদ্যুৎ খাতের গুরুত্বপূর্ণ এই বিতরণ সংস্থায় স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনা এবং উত্তরবঙ্গের ২২ লাখ গ্রাহকের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বর্তমান এমডিকে দ্রুত অপসারণের দাবি জানিয়েছেন নেসকোর প্রকৌশলী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।

তাঁদের দাবি, সংস্থার প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি ফেরাতে এবং বিদ্যুৎ সেবার মান উন্নত করতে দ্রুত একজন সৎ, দক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তাকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে।