২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় নিজ এলাকা চকরিয়ায় মানবিক কার্যক্রম শুরু করেন আলী তানভীর। এখন বান্দরবানের লামা আদর্শ গার্লস হাই স্কুলে ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে কর্মরত এই তরুণ ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাঁচ শতাধিক প্রতিবন্ধী পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
তাঁর উদ্যোগে ১১০ প্রতিবন্ধী শিশু কৃত্রিম পা, হুইলচেয়ারসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়ক উপকরণ পেয়েছে। মানবিক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ ভালোবেসে অনেকে তাঁকে ‘প্রতিবন্ধীদের বন্ধু’ বলে ডাকেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন আলী তানভীর। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং প্রতিবন্ধী শিশুদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ তৈরির চেষ্টা তাঁর দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
শুরুতে এলাকার অসহায় ও প্রতিবন্ধী শিশুদের খোঁজখবর নিয়ে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতা করতেন তিনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর উদ্যোগের পরিধি বেড়েছে, যুক্ত হয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও। কোনো পরিবারকে দিয়েছেন আর্থিক সহায়তা ও খাদ্যসামগ্রী, আবার কোনো পরিবারকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং চিকিৎসাসেবা পেতে সহযোগিতা করেছেন।
ফেনীর বন্যায় সহায়ক উপকরণ হারিয়ে ফেলা ১০ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্যও নতুন করে প্রয়োজনীয় উপকরণের ব্যবস্থা করেন আলী তানভীর। এ ছাড়া সীতাকুণ্ডের ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডের সময় লাশ বহনের কাজে সহযোগিতা করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন কার্যক্রমেও যুক্ত ছিলেন।
রূপসী ও তামান্নার গল্প
২০২১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় পায়ের গোড়ালি হারায় রূপসী। দুর্ঘটনার পর তার চিকিৎসা ও পড়াশোনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে রূপসীর পাশে দাঁড়ান আলী তানভীর। চিকিৎসার পাশাপাশি তার শিক্ষাজীবন এগিয়ে নিতেও সহযোগিতা করে যাচ্ছেন তিনি। রূপসীর মা জানান, মেয়ের চিকিৎসা ও পড়াশোনার ক্ষেত্রে তানভীর সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। বর্তমানে রূপসী ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে।
জন্মগতভাবে দুই হাত ও এক পা নিয়ে জন্ম নেওয়া তামান্নার জন্য ২০২২ সালে কৃত্রিম পায়ের ব্যবস্থা করেন আলী তানভীর। তবে বিদ্যালয় দূরে হওয়া এবং যাতায়াত ও ওঠানামার অসুবিধার কারণে তামান্নার পক্ষে মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা শুরু করা সম্ভব হয়নি।
তামান্নার বাস্তবতা তুলে ধরে আলী তানভীরের উদ্যোগের পাশাপাশি উঠে এসেছে প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা ও চলাচলের সুযোগ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা। শুধু চিকিৎসা কিংবা সহায়ক উপকরণ দিলেই তাদের সব সমস্যা সমাধান হয় না। প্রয়োজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহজ প্রবেশাধিকার, নিরাপদ যাতায়াত এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশ।
ফেসবুকের সহযোগিতায় বিস্তৃত হয়েছে উদ্যোগ
কীভাবে শুরু হয়েছিল এই মানবিক উদ্যোগ, জানতে চাইলে আলী তানভীর বলেন, প্রথমে প্রতিবন্ধী শিশুদের বাড়িতে গিয়ে তাদের খোঁজখবর নেন তিনি। যেসব পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ, তাদের স্থানীয় অর্থোপেডিক সেন্টারে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সহায়ক উপকরণ দেওয়ার চেষ্টা করেন।
তিনি জানান, অনেক পরিবারের পক্ষে সন্তানের চিকিৎসার ব্যয় বহন করা সম্ভব হয় না। এমন পরিস্থিতিতে শিশুটির ছবি ও চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে ফেসবুকে পোস্ট করেন তিনি। তাঁর ফেসবুক বন্ধুরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে সেই অর্থ দিয়ে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়ক উপকরণের ব্যবস্থা করা হয়।
আলী তানভীরের মানবিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যাংক কর্মকর্তা সাথীর মতো অনেকেই। ২০২০ সাল থেকে ফেসবুকের মাধ্যমে তানভীরের সঙ্গে পরিচয় সাথীর। সরাসরি সব সময় অসহায় মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব না হলেও তানভীরের মাধ্যমে তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন তিনি।
সাথী বলেন, ব্যস্ততার কারণে সরাসরি যেতে না পারলেও তিনি তানভীরের মাধ্যমে সমাজের এই মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। প্রতিবন্ধীদের প্রতি তার ভালোবাসা দেখে তিনি তাকে ‘প্রতিবন্ধীদের বন্ধু’ বলে ডাকেন।
প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রত্যাশা সম্পর্কে জানতে চাইলে আলী তানভীর বলেন, তিনি এমন একটি সমাজ দেখতে চান, যেখানে প্রতিবন্ধী শিশুরা নিজেদের অসহায় মনে করবে না। তাদের পরিবারকে সন্তানের চিকিৎসা, পড়াশোনা কিংবা চলাচলের ব্যবস্থা করতে গিয়ে অসহনীয় কষ্টের মুখোমুখি হতে হবে না। প্রতিটি প্রতিবন্ধী শিশু যেন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, সহায়ক উপকরণ ও শিক্ষার সুযোগ পায় এবং নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী সামনে এগিয়ে যেতে পারে।
শুধু সহানুভূতি দেখানো নয়, তাদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মনে করেন তিনি। সরকার, সমাজের বিত্তবান মানুষ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন সম্মিলিতভাবে এগিয়ে এলে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব বলে তাঁর বিশ্বাস।




মন্তব্য করুন