শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলায় এক মাসেরও বেশি সময় ধরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ডের পদ শূন্য রয়েছে। এতে জমির নামজারি, জমাখারিজ, খতিয়ান সংশোধনসহ বিভিন্ন ভূমিসেবা পেতে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। সময়মতো কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় কেউ আর্থিক সংকটে পড়েছেন, আবার কেউ জমি হস্তান্তর করতে না পেরে বিপাকে রয়েছেন। এমনকি মায়ের ক্যানসারের চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতেও হিমশিম খাচ্ছেন এক জমির মালিক।

উপজেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রায় চার লাখ মানুষের বসবাস ভেদরগঞ্জ উপজেলায়। ১৩টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ উপজেলায় প্রতি মাসে গড়ে দুই হাজারের বেশি নামজারির আবেদন জমা পড়ে। গত ২২ সেপ্টেম্বর সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে এম রাফসান রাব্বি বদলিজনিত কারণে নারায়ণগঞ্জে চলে যাওয়ার পর থেকে পদটি শূন্য রয়েছে।

বর্তমানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবুবকর সিদ্দিক অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ভূমি অফিসের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তবে উপজেলা প্রশাসনের অন্যান্য দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ভূমি অফিসের কাজ তদারকি করতে গিয়ে নিয়মিত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে জমিসংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে। এতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার সেবাপ্রত্যাশীদের ভোগান্তি বাড়ছে।

প্রবাসীর ছুটি শেষ, তবু হয়নি নামজারি

নামজারির আবেদন করেও নির্ধারিত সময়ে সেবা না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন প্রবাসী খলিল মিয়া। তিনি বলেন, এক মাস আগে নামজারির আবেদন করেছেন। কিন্তু এখনো কাজ শেষ হয়নি। এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ফেলে তাঁকে একাধিকবার ভূমি অফিসে যাতায়াত করতে হচ্ছে।

খলিল মিয়া বলেন, অনলাইনে নামজারির আবেদন ২৮ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি হওয়ার কথা থাকলেও এসিল্যান্ড না থাকায় দীর্ঘ সময় লাগছে। তিনি প্রবাসী হওয়ায় দেশে অবস্থানের জন্য পাওয়া ছুটিও শেষ হয়ে আসছে। অথচ কবে নামজারি সম্পন্ন হবে কিংবা কবে নতুন এসিল্যান্ড যোগ দেবেন, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। এতে তিনি চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

জমি বিক্রি করেও মিলছে না চিকিৎসার টাকা

ভূমিসেবার দীর্ঘসূত্রতায় আরও জটিল পরিস্থিতিতে পড়েছেন জসিম খালাসি। তাঁর মা সুফিয়া খাতুন ক্যানসারে আক্রান্ত। মায়ের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে তিনি জমি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন। বাড়ির পাশের এক প্রতিবেশীর কাছে জমি বিক্রিও করেছেন। কিন্তু জমি হস্তান্তরের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় ক্রেতার কাছ থেকে পুরো টাকা বুঝে পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ তাঁর।

এদিকে জমিসংক্রান্ত কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় জমির দখল বুঝিয়ে দেওয়ার বিষয়টিও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সব মিলিয়ে মায়ের চিকিৎসার খরচ জোগাড় করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁর পরিবারের।

দুই মাসেও মেলেনি সেবার নিশ্চয়তা

আরেক ভুক্তভোগী সাইফুল ইসলাম জানান, দুই মাস আগে নামজারির আবেদন করেও এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি জানতে পারেননি তিনি।

সাইফুল ইসলাম বলেন, ভূমি অফিসের কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না, কবে তাঁর নামজারির কাজ শেষ হবে। দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ শূন্য থাকায় সাধারণ মানুষকে কেন এমন ভোগান্তি পোহাতে হবে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

আর্থিক সংকটে দলিল লেখকরাও

ভেদরগঞ্জের দলিল লেখক আমজাদ হোসেন বলেন, উপজেলায় প্রতিদিন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জমি কেনাবেচা হয়। এসব লেনদেনের সঙ্গে নামজারি, জমির বণ্টন ও ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধসহ নানা প্রক্রিয়া জড়িত। কিন্তু এসিল্যান্ড না থাকায় অনেক কাজ সময়মতো সম্পন্ন হচ্ছে না। এতে জমির মালিক ও ক্রেতারা যেমন সমস্যায় পড়ছেন, তেমনি কাজ কমে যাওয়ায় দলিল লেখকরাও আর্থিক সংকটে ভুগছেন।

উপজেলা ভূমি অফিসের এক কর্মকর্তা জানান, এসিল্যান্ডের অধীনে থাকা ইউনিয়ন পর্যায়ের ভূমি কার্যালয়গুলোর সেবা কার্যক্রমও এ পরিস্থিতিতে প্রভাবিত হচ্ছে। বিশেষ করে নামজারি ও জমাখারিজের কাজ ধীরগতিতে চলছে। সেবাপ্রত্যাশীদের সময়মতো কাজ করে দিতে না পারায় তাঁদের অসন্তোষ সামাল দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।

দ্রুত পদায়নের জন্য চিঠি

এ বিষয়ে ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবুবকর সিদ্দিক বলেন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদে কর্মকর্তা পদায়নের জন্য জেলা প্রশাসককে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। ভূমি অফিসের কার্যক্রম যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় তদারকি করা হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, দ্রুত সময়ের মধ্যে এ উপজেলায় নতুন এসিল্যান্ড পদায়ন করা হবে।

তবে নতুন কর্মকর্তা কবে যোগ দেবেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ফলে নামজারিসহ জরুরি ভূমিসেবার অপেক্ষায় থাকা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কবে কমবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।