দেশে দক্ষ পেশাদার চালক তৈরি, সড়ক নিরাপত্তা বাড়ানো এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ৬৮ হাজার চালককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে পরিচালিত দুটি কর্মসূচির মাধ্যমে নতুন চালক তৈরি এবং অভিজ্ঞ চালকদের দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছে সংস্থাটি।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত বাংলাদেশ রোড সেফটি প্রজেক্টের আওতায় প্রশিক্ষণ পাবেন ৬০ হাজার চালক। তাঁদের মধ্যে ৪০ হাজার তরুণকে নতুন করে পেশাদার চালক হিসেবে গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি পেশায় নিয়োজিত ২০ হাজার চালককে দেওয়া হবে দক্ষতা ঝালাইয়ের প্রশিক্ষণ।
২০২৬ সালের মে মাসে শুরু হওয়া এ কর্মসূচি ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে। বিআরটিসির চারটি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ও ২৩টি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের মাধ্যমে কার্যক্রমটি পরিচালিত হবে। ঢাকা, গাজীপুর, গোপালগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট, খুলনা ও রংপুরসহ বিভিন্ন এলাকার কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
বিআরটিসির প্রাক্কলন ও কাজের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ (আইসিডব্লিউএস) বিভাগের মহাব্যবস্থাপক ফাতেমা বেগমের ভাষ্য, দক্ষ চালক তৈরির পাশাপাশি দেশজুড়ে সড়ক নিরাপত্তার মান উন্নয়নে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অন্যদিকে, এডিবির অর্থায়নে পরিচালিত স্কিলস ফর ইন্ডাস্ট্রি কম্পিটিটিভনেস অ্যান্ড ইনোভেশন প্রোগ্রাম (সিসিপ)-এর আওতায় আরও আট হাজার নতুন চালককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে তাঁদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য চালকদের ইংরেজি ও আরবি ভাষায় যোগাযোগের দক্ষতা বাড়ানোর ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
সিসিপ কর্মসূচিতে প্রশিক্ষণের মেয়াদ ৩৬০ ঘণ্টা। এতে নিরাপদ ও আত্মরক্ষামূলক গাড়ি চালানো, যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণ, যান্ত্রিক ত্রুটি শনাক্ত করা এবং পেশাদার চালক হিসেবে প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালনের বিষয়গুলো শেখানো হয়।
এ কর্মসূচিতে নারী চালকদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। জেন্ডার অ্যাকশন প্ল্যানের আওতায় নারী যাত্রীদের হয়রানি প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি নারীদের ড্রাইভিং পেশায় উৎসাহিত করা হচ্ছে। নারীদের জন্য ‘পিঙ্ক বাস’ সেবা আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্যেও এ প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, শুরুতে নারীদের আগ্রহ তুলনামূলক কম থাকলেও বর্তমানে এ পেশায় যুক্ত হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
এর আগে স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (এসইআইপি)-এর মাধ্যমে প্রায় ৪৭ হাজার ৫০০ জনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে বিআরটিসি।
বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে ফাতেমা বেগম জানান, প্রথম পর্যায়ে প্রায় ছয় হাজার ৪০০ জন নতুন চালকের প্রশিক্ষণ শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও প্রায় ছয় হাজার ৬০০ জনের প্রশিক্ষণ চলছে। তাঁর মতে, চালকদের কারিগরি জ্ঞান ও সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদেশে চাকরির সুযোগ তৈরিতেও এ উদ্যোগ সহায়ক হবে।
এদিকে, সিসিপ প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয় ২০২৪ সালের ১ জুলাই। এর প্রথম পর্যায়ের প্রশিক্ষণ শুরু হয় ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি। বিআরটিসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চারটি পর্যায়ে এ পর্যন্ত দুই হাজার ৮৫০ জন প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। বর্তমানে পঞ্চম পর্যায়ে ৬৫০ জনের প্রশিক্ষণ চলছে।
প্রশিক্ষণ সফলভাবে শেষ করা ব্যক্তিদের সরকারি স্বীকৃত সনদ ও বিনা মূল্যে পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিয়মিত উপস্থিতির ভিত্তিতে যাতায়াত ও টিফিন ভাতাও দেওয়া হয়েছে। মোটর ড্রাইভিংয়ের পাশাপাশি গাড়ির সাধারণ রক্ষণাবেক্ষণ ও যান্ত্রিক সমস্যা মোকাবিলার ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিআরটিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ রোড সেফটি প্রজেক্টের আওতায় শিগগিরই কর্মরত চালকদের জন্য রিফ্রেশার প্রশিক্ষণ শুরু হবে। এ কার্যক্রমে অংশ নিতে আগ্রহীদের নিকটস্থ বিআরটিসি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে যোগাযোগ করে নিবন্ধনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

মন্তব্য করুন