ভারতের অরুণাচল প্রদেশের সীমান্ত এলাকায় ভারত ও চীনের সেনাদের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। চীনা সেনাদের অনুপ্রবেশ এবং ভারতীয় বাহিনীর টহলে বাধা দেওয়ার অভিযোগের মধ্যে দুই দেশের সেনারা মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন। এ পরিস্থিতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক কঠোর অবস্থানের ভাবমূর্তির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

ভারতের ইন্দো-তিব্বত বর্ডার পুলিশ (আইটিবিপি) প্রধান শত্রুজিৎ কাপুর সম্প্রতি সীমান্তে দুই দেশের সেনাদের মুখোমুখি অবস্থানের বিষয়টি জানিয়েছেন। তবে অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবানসিরি এলাকায় চীনা বাহিনীর তৎপরতা নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে ভারত সরকার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।

রাজ্যটির কংগ্রেস নেতা বসিরাম সিরামের দাবি, চীনা সেনারা ভারতের ভূখণ্ডের প্রায় ৫০ কিলোমিটার ভেতরে অবস্থান করছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পাহাড়ের চূড়ায় চীনা সেনাদের দেখা যাচ্ছে, আর ভারতীয় সেনারা রয়েছেন নিচের দিকে। তবে এসব দাবি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

গত মাসে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভারত সফর এবং নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি নিয়েও বেইজিং ও নয়াদিল্লির মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহ তৈরি হয়েছে। নতুন করে সীমান্ত উত্তেজনা সেই অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

দীর্ঘদিনের সীমান্তবিরোধ

ভারত ও চীনের সীমান্ত বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে ১৯১৪ সালের সিমলা কনভেনশনে নির্ধারিত ম্যাকমোহন লাইন। ভারত এই রেখাকে দুই দেশের সীমান্ত হিসেবে বিবেচনা করলেও চীন তা স্বীকার করে না। বেইজিং অরুণাচল প্রদেশকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দাবি করে এবং অঞ্চলটিকে ‘দক্ষিণ তিব্বত’ বা ‘জাংনান’ নামে উল্লেখ করে।

এ ছাড়া, চীন আকসাই চীন অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে, যার ওপর ভারতও দাবি জানিয়ে আসছে। ১৯৯৩ সালে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি বরাবর শান্তি বজায় রাখতে দুই দেশ চুক্তি করলেও সীমান্তের সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিয়ে মতবিরোধ রয়ে গেছে।

২০২০ সালের জুনে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনাদের সংঘর্ষে অন্তত ২০ ভারতীয় সেনা নিহত হন। পরে চীন তাদের চার সেনার মৃত্যুর কথা স্বীকার করে। ওই ঘটনার পর সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের বিরোধী দলগুলো সরকারের কাছে স্বচ্ছতা দাবি করে। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চীনা সেনাদের বিরুদ্ধে নিজেদের ভূখণ্ডে স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টার অভিযোগ তুললেও দুই দিন পর মোদি বলেছিলেন, ভারতের ভূখণ্ডে কেউ প্রবেশ করেনি। সরকারের বক্তব্যের এই পার্থক্য নিয়ে তখন প্রশ্ন ওঠে।

চীনের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ

আইটিবিপি প্রধান শত্রুজিৎ কাপুরের মতে, সীমান্তবর্তী এলাকায় চীনের সামরিক সক্ষমতা বেড়েছে। ফলে প্রচলিত পদ্ধতিতে সরাসরি সংঘাত মোকাবিলা করা ভারতীয় বাহিনীর জন্য কঠিন হতে পারে। এ কারণে লাদাখের মতো পরিস্থিতি সামাল দিতে বাহিনীর সদস্যদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক প্রবীণ ডনথি মনে করেন, দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ চললেও সীমান্তে উত্তেজনা চীনের চাপ সৃষ্টির কৌশলের অংশ হতে পারে। তার মতে, সীমান্তের সুনির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারিত না থাকায় মাঝেমধ্যে এমন অচলাবস্থা তৈরি হয়, যা কখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, চীনা বাহিনী প্রতিষ্ঠিত টহলব্যবস্থা থেকে সরে গেলে সীমান্ত পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। তবে বর্তমান মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি।

স্থায়ী সমাধান নিয়ে অনিশ্চয়তা

সীমান্ত বিরোধ নিরসনে ভারত ও চীন সামরিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। গত ৬ আগস্ট সীমান্তবিষয়ক পরামর্শ ও সমন্বয় ব্যবস্থার (ডব্লিউএমসিসি) ৩৬তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেপ্টেম্বরে অরুণাচল প্রদেশে প্রথমবারের মতো কমান্ডার পর্যায়ের বৈঠকও হয়। তবে এসব উদ্যোগ সীমান্তের উত্তেজনা পুরোপুরি দূর করতে পারেনি।

দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক বি আর দীপকের মতে, নতুন করে অনুপ্রবেশের অভিযোগ মোদি সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তার মতে, সামরিক ও স্থানীয় পর্যায়ের বৈঠক সাময়িকভাবে উত্তেজনা কমাতে পারলেও দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিরোধের স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না।

বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া সীমান্তে শান্তি বজায় রাখার প্রচেষ্টা দুর্বল থেকে যেতে পারে। ফলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগের পাশাপাশি সীমান্ত বিরোধও মোদি সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তাগত ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকছে।