মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের অভিযানের ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহে ব্যর্থ হওয়ার কথা জেরায় জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, জিয়াউলের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তদন্তকালে র‍্যাব-৮ এর আর্কাইভ থেকে অভিযানের সমর্থনে সিসিটিভি ফুটেজ, ডিজিটাল প্রমাণপত্র এবং জিয়াউল আহসান ও গোয়েন্দা শাখার সদস্যদের চলাচল-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে জেরা চলাকালীন তিনি এ তথ্য জানান। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলার একমাত্র আসামি জিয়াউলের বিরুদ্ধে ১৫তম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন রফিকুল ইসলাম। নিরাপত্তার স্বার্থে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তাকে কারাগারে রেখেই ভার্চুয়ালি বিচারকাজ চলছে। পঞ্চম দিনের মতো তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরা করেন জিয়াউলের আইনজীবী সাহিদুর রহমান; জেরায় অভিযান-সংক্রান্ত নানা ধরনের প্রশ্ন করেন তিনি।

প্রশ্নের জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা রফিকুল বলেন, আমার বর্ণিত যে-সব অভিযানে নির্বাহী তদন্ত হয়েছে, সেসবের প্রতিবেদন সংগ্রহ করেছি। এসব প্রতিবেদনে জিয়াউল আহসানের নাম নেই। তবে এগুলো ফরমায়েশি প্রতিবেদন। প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হতো কিনা—আইনজীবীর এমন প্রশ্নে সাক্ষী জানান, যে-সব অভিযান সঠিকভাবে হতো, সেসব প্রতিবেদন পাঠানো হতো। যে-সব সঠিকভাবে হতো না, তার প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হতো না।

তদন্ত চলাকালীন র‍্যাব-৮ এ গিয়েছিলেন উল্লেখ করে রফিকুল বলেন, র‍্যাব-৮ এর আর্কাইভ থেকে আমার বর্ণিত অভিযানের সমর্থনে সিসিটিভি ফুটেজ বা কোনো ডিজিটাল প্রমাণপত্র, জিয়াউল আহসান এবং গোয়েন্দা শাখার সদস্যদের চলাচল-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি। এ ছাড়া আমার বর্ণিত অভিযানে আহত-নিহতদের নাম এবং অভিযানে সম্পৃক্ত র‍্যাব সদস্যদের নাম সংগ্রহের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে গিয়েছিলাম; তবে কোনো চাহিদাপত্র দেইনি।

তদন্ত কর্মকর্তার এমন জবাবের প্রেক্ষিতে আইনজীবী সাহিদুর রহমান বলেন, ‘আপনি র‍্যাব-৮ এর এবং র‍্যাব সদর দপ্তরে কোনোদিনও যাননি।’ পাল্টা জবাবে সত্য নয় বলে জানান রফিকুল ইসলাম।

এর আগে ৩০ সেপ্টেম্বর তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। জবানবন্দিতে তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে কোথায় কোথায় গেছেন, কী কী তথ্য-উপাত্ত ও আলামত সংগ্রহ করেছেন এবং সেসব কীভাবে মামলার অভিযোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তার বিস্তারিত তুলে ধরেন তিনি।

এ মামলায় সুনির্দিষ্ট তিনটি অভিযোগ আনা হয়। প্রথমটি হলো—২০১১ সালের ১১ জুলাই রাতে গাজীপুর সদর থানার পুবাইলে সড়কের পাশে জিয়াউলের সরাসরি উপস্থিতিতে সজলসহ তিন হত্যা। দ্বিতীয় অভিযোগে অপরাধের সময়কাল ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত; এ সময়টায় বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের চরদুয়ানী খালঘেঁষা বলেশ্বর নদীর মোহনায় নজরুল, মল্লিকসহ ৫০ জনকে হত্যা। তৃতীয় অভিযোগেও ৫০ হত্যার অভিযোগ এনেছে প্রসিকিউশন; অর্থাৎ দ্বিতীয় অভিযোগে উল্লেখিত সময়ে বরগুনার বলেশ্বর নদী ও বাগেরহাটের শরণখোলায় সুন্দরবনের বিভিন্ন অঞ্চলে তথাকথিত বনদস্যু দমনের আড়ালে মাসুদসহ ৫০ জনের প্রাণ নেওয়া।

এসব হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর জিয়াউলকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। ১৭ ডিসেম্বর তার বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়। একই দিন ফরমাল চার্জ দাখিল করে প্রসিকিউশন।