দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, পুলিশের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক কর্মীদের মূল্যায়ন নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ। তাঁর অভিযোগ, সরকারের সমালোচনা করলেই মামলা ও গ্রেপ্তারের মুখে পড়তে হচ্ছে মানুষকে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ প্রকাশের স্বাধীনতাও সংকুচিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) রাজধানীর জিরো পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের প্রতিবাদে ৩০ অক্টোবরের বিক্ষোভ সমাবেশ সফল করতে লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগকালে এসব কথা বলেন হাসনাত আব্দুল্লাহ।

তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষ নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করতেও ভয় পাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে উত্তর কোরিয়ার নির্বাচনী ব্যবস্থার উদাহরণ টেনে তিনি অভিযোগ করেন, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও এমন দিকে যাচ্ছে, যেখানে মানুষের কাছে খুশি থাকার প্রত্যাশা করা হচ্ছে, কিন্তু অসন্তোষ প্রকাশের সুযোগ থাকছে না।

সরকারের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করার অভিযোগ তুলে হাসনাত বলেন, গত আট মাসে সরকারের সমালোচনা ও নিজস্ব মত প্রকাশের কারণে ৩০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, নির্বাচনের আগে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দ্বিমত প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থানের কথা বললেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিরোধী মতের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার এমনকি ক্রসফায়ারের হুমকি দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকিরের বক্তব্য এবং পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতিরও সমালোচনা করেন এনসিপির এই নেতা। আইজিপির বক্তব্য নিয়ে আপত্তি উঠলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁকে সরল মানুষ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন বলে উল্লেখ করে হাসনাত প্রশ্ন তোলেন, এ ধরনের বক্তব্যের দায় কীভাবে এড়ানো যায়। তাঁর মতে, জনগণের পুলিশ হিসেবে বাহিনীকে গড়ে তোলার যে প্রত্যাশা ছিল, তা এখনো পূরণ হয়নি।

হাসনাতের অভিযোগ, অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পুলিশকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্তও বাহিনীটিকে ব্যবহার করে এর সদস্যদের মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। বর্তমান পরিস্থিতিতে পুলিশের মধ্যে রাজনৈতিক আনুগত্যের বিভাজন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আইজিপির নিয়োগ ও ব্যক্তিগত সম্পদ নিয়ে অভিযোগ তুলে হাসনাত বলেন, আলী হোসেন ফকির বিদেশে বাড়ি কেনা শুরু করেছেন বলে তাঁরা শুনছেন। বিষয়টি তদন্তের দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে অবস্থান সত্য হলে আইজিপিকে অপসারণের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কোনো বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে হাসনাত বলেন, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের স্বার্থে ব্যবহৃত হলে সংকটের সময় জুনিয়র কর্মকর্তা ও কনস্টেবলদেরই বিপদে পড়তে হয়। তাঁর মতে, পুলিশের দায়িত্ব কোনো ব্যক্তির বক্তব্য অনুসরণ করা নয়; বরং সংবিধান, দেশের মানুষ, ভূখণ্ড ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা।

রাজনৈতিক কর্মীদের ত্যাগের মূল্যায়ন নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেন এনসিপির এই নেতা। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূল থেকে উঠে আসা কর্মীরা দীর্ঘদিন নির্যাতন ও রাজনৈতিক সংকটের মুখে থাকলেও ক্ষমতার পালাবদলের পর তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। অন্যদিকে, সংকটের সময় বিদেশে অবস্থান করা নেতারা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দেশে ফিরে নিজেদের সন্তানদের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রসঙ্গ টেনে হাসনাত বলেন, ১৭ বছর ধরে অনেক কর্মী নির্যাতন, হামলা ও মামলার শিকার হয়েছেন। অথচ এখন তাঁদের মন্ত্রীদের গাড়ির পেছনে ছুটতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর আশঙ্কা, ভবিষ্যতে তাঁদের মন্ত্রীদের সন্তানদের পেছনেও ছুটতে হতে পারে।

রাজনৈতিক সহিংসতা ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন হাসনাত। ছাত্রদল নেতা শাকিলের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন জুলুম, হামলা ও মামলার শিকার হওয়া কর্মীদের জীবনের মূল্য মাত্র ২০ লাখ টাকা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অন্যদিকে, একজন সংসদ সদস্যের ছেলে গুলি করে কাউকে হত্যা করলে তাঁর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তা দেখতে চান তিনি। এমন ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান হাসনাত।

তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের সন্তান ও পরিবারকে বিদেশে নিরাপদে রাখলেও দেশের তরুণদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে কর্মীদের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।