জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতা ও জনপ্রিয় চিকিৎসক ডা. এজাজুল ইসলাম জানালেন, তিনি আজীবন রোগীদের কাছ থেকে মাত্র ৩০০ টাকা ভিজিটই নেবেন। তার ভাষায়, “আমৃত্যু আমার ভিজিট ৩০০ টাকাই থাকবে। অপ্রয়োজনীয়ভাবে টাকার পেছনে ছোটা একধরনের মানসিক ব্যাধি।”
১৯ জুলাই, প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুবার্ষিকীতে যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় নিজের পেশাদার দর্শন, ব্যক্তিজীবনের উপলব্ধি এবং হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করেছেন তিনি।
১৯৯৮ সালে ‘সবুজ সাথী’ নামের একটি নাটকের মাধ্যমে হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে তার কাজের শুরু হয়। নাটকে স্বাস্থ্য বিভাগের এক মাঠকর্মীর ছোট চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে যাত্রা শুরু হলেও এরপর থেকে প্রখ্যাত এই লেখক-নির্মাতার প্রায় প্রতিটি কাজেই ছিলেন ডা. এজাজ। ১৯৯৯ সালে হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত ‘শ্রাবণ মেঘের দিনে’ চলচ্চিত্রে “পরান” চরিত্রে অভিনয় করে তিনি আলোচনায় আসেন।
হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, “স্যার শুধু নাট্যকার বা নির্মাতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন নিঃস্বার্থ ও মানবিক মানুষ। প্রচারের জন্য নয়, হৃদয়ের তাগিদে কাজ করতেন। কখনো আত্মপ্রচার করতেন না। এক শীতে দেখেছি—রাতের শুটিং শেষে কোনো সহশিল্পী ঘুমিয়ে আছে, তিনি চুপচাপ গিয়ে তার গায়ে কম্বল জড়িয়ে দিয়েছেন। এমন মানুষ আর দেখা যায় না।”
তিনি জানান, হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন সত্যবাদিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। মিথ্যা বলা তিনি একেবারেই সহ্য করতেন না। অন্যদিকে খুব সহজেই খুশি হতেন— “একবার বৃষ্টির দিনে খাবারে ইলিশ মাছ দেখে শিশুদের মতো আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিলেন। এমন সরল ও আনন্দময় মানুষ আর খুব বেশি দেখি না।”
একটি স্মরণীয় ঘটনার কথা তুলে ধরে ডা. এজাজ বলেন, ‘শ্যামল ছায়া’ সিনেমার শুটিংয়ের সময় স্যারের নির্ধারিত লোকেশন গিয়ে দেখা যায় সেখানে শুটিং করা সম্ভব নয়। বিষয়টি স্যারকে না জানিয়েই তিনি বিকল্প লোকেশন ঠিক করেন এবং শুটিং চালিয়ে যান। হুমায়ূন আহমেদ কাজটি দেখে অভিভূত হন এবং বলেন, “গুড জব, ডাক্তার।” ডা. এজাজ বলেন, “তার মুখে এমন কথা পাওয়া আমার জীবনের অন্যতম প্রাপ্তি।”
নুহাশ পল্লীতে রিকশায় চড়ে হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে ঘোরার দিনটির কথা স্মরণ করে বলেন, “ওইদিন বুঝেছি, তিনি বৃষ্টিতে ভিজতে খুব ভালোবাসতেন। স্যারের সঙ্গে সময় কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত ছিল জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার।”
এই গুণী নির্মাতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবং তার অজানা দিকগুলো মানুষের সামনে তুলে ধরতেই ডা. এজাজ ‘আমার হুমায়ূন স্যার’ নামে একটি স্মৃতিগ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। বলেন, “মানুষ আজ স্যারের নতুন লেখা পায় না, কিন্তু তার রেখে যাওয়া প্রতিটি বই আজও সমানভাবে বিক্রি হয়। আমি মনে করি, তার জীবনের অনেক দিক এখনো অজানা, যা জানার অধিকার মানুষের আছে। তাই নিয়মিত লেখালেখি চালিয়ে যাবো।”
নিজের চিকিৎসক জীবনের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে বলেন, “অনেকে আমাকে বলেন, আমি কেন ভিজিট বাড়াই না। এমনকি আমার জুনিয়ররাও বেশি নেন। স্টাফরাও বলে, এতে আমার মানহানি হতে পারে। কিন্তু আমি এসব নিয়ে ভাবি না। আমি যা পাচ্ছি, তাতেই তৃপ্ত। আমার কোনো অভাব নেই। ছেলেমেয়ের পড়াশোনা থেকে শুরু করে জীবনের সব প্রয়োজন আল্লাহ পূরণ করছেন। এত টাকা দিয়ে কী হবে? আমি মনে করি, টাকা পেছনে ছুটে যাওয়া একটা মানসিক রোগ। তাই আমার ভিজিট আমৃত্যু ৩০০ টাকাই থাকবে।”
বর্তমানে ‘দেনা পাওনা’ নামে একটি ধারাবাহিকে অভিনয় করছেন তিনি। পাশাপাশি কিছু খণ্ডনাটকেও অংশ নিচ্ছেন। বলেন, “আগের মতো ব্যস্ততা না থাকলেও অভিনয়ের মধ্যেই আছি। এটা আমার ভালোবাসা।”
ডা. এজাজুল ইসলাম শুধু একজন শিল্পী বা চিকিৎসক নন—তিনি একজন নৈতিক ও মানবিক ব্যক্তিত্ব, যিনি জীবন ও কর্মের মাধ্যমে প্রমাণ করে চলেছেন, সেবাই সবচেয়ে বড় আনন্দ।

মন্তব্য করুন