‘টেকসই বাংলাদেশ বিনির্মাণে চাই যুববান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থা’ – এই প্রতিপাদ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক যুব দিবস-২০২৫ বিশেষ গুরুত্ব ও উৎসাহের সঙ্গে উদযাপন করেছে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), মাদারীপুর। অনুষ্ঠানটি শুরু হয় সনাক কার্যালয় থেকে বের হওয়া একটি বর্ণিল র্যালি দিয়ে, যা পৌরসভার সামনের সড়ক দিয়ে এগিয়ে যায়। এরপর মাদারীপুর প্রেসক্লাবের সামনে মূল সড়কে আয়োজন করা হয় মানববন্ধন।

এই র্যালি ও মানববন্ধনে সনাক, ইয়ুথ এনগেজমেন্ট অ্যান্ড সাপোর্ট (ইয়েস), এসিজি-এর সদস্য, স্কাউটস, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, স্থানীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, বেসরকারি সংস্থা, যুব প্রতিনিধি, সাংবাদিক এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের নাগরিকসহ প্রায় ৭০ জন (নারী ২২ জন) অংশগ্রহণ করেন।

বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন থেকে শুরু করে জনগণের মুক্তি ও অধিকার আদায়ের প্রতিটি পর্বে তরুণরাই ছিল মুখ্য চালিকাশক্তি। সম্প্রতি তারুণ্যের নেতৃত্বে পরিচালিত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে কর্তৃত্ববাদের পতন ঘটে, যা জাতীয় পর্যায়ে নয়, বৈশ্বিক পর্যায়েও এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এই তারুণ্যের আদর্শ ও শক্তিকে ধারণ করে রাখতে হলে জাতীয় ও স্থানীয় উভয় পর্যায়ে তাদের কণ্ঠস্বরকে উপেক্ষা করা যাবে না।

কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের তরুণ সমাজের মধ্যে হতাশা ও উপেক্ষার অভিমান ক্রমশ গভীর হচ্ছে। রাজনৈতিক স্বার্থ, সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং কাঠামোগত বৈষম্যের কারণে তারা সামাজিক ও রাজনৈতিক নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় পূর্ণাঙ্গ অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে, তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও সুশাসিত বাংলাদেশ গঠনে যুবসমাজের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয় আন্তর্জাতিক যুব দিবস-২০২৫ উপলক্ষে।

উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের বিশ্ব যুব ফোরামে তরুণদের দাবির প্রেক্ষিতে ১৯৯৮ সালে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের *World Conference of Ministers Responsible for Youth*-এ ১২ আগস্টকে আন্তর্জাতিক যুব দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব করা হয়। ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এ প্রস্তাবের সমর্থন জানায় এবং ২০০০ সাল থেকে প্রতি বছর ১২ আগস্ট জাতিসংঘের উদ্যোগে এ দিবস পালিত হয়।

এ বছরের আন্তর্জাতিক যুব দিবসের প্রতিপাদ্য: **”Intergenerational Solidarity: Creating a World for All Ages”**, যার মূল বার্তা হলো—স্থানীয় তরুণদের অংশগ্রহণ ও উদ্ভাবনী উদ্যোগকে এসডিজি বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দেওয়া। অন্যদিকে, বাংলাদেশ এ বছর প্রথমবারের মতো “প্রযুক্তিনির্ভর যুবশক্তি, বহুপাক্ষিক অংশীদারিত্বে অগ্রগতি” প্রতিপাদ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক যুব দিবসের সঙ্গে সমান্তরালে জাতীয় যুব দিবস পালন করছে।

মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন খান মোঃ শহীদ, সভাপতি, সনাক মাদারীপুর। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের প্রতিটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনে তরুণরাই এগিয়ে এসেছে, অকাতরে জীবন উৎসর্গ করেছে। কিন্তু আমরা এখনও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাইনি। এখন সময় এসেছে যুবশক্তিকে সুসংগঠিত করতে, তাদের আইনগত অধিকার নিশ্চিত করতে, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে এবং রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় তাদের অংশগ্রহণ ও বিকাশের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে।”

অন্যান্য বক্তাদের মধ্যে ছিলেন সনাক সদস্য মমতাজ হক, কুমার লাভলু এবং ইয়েস দলনেতা কামরুল হাসান। তারা দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে যুবসমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরেন এবং যুববান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও টেকসই উন্নয়নের পথনির্দেশনা দেন।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর উদ্যোগে চলমান দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক আন্দোলনে তরুণ ও যুবসমাজ একটি প্রধান চালিকাশক্তি। এ কারণে টিআইবি প্রতিবছরের ন্যায় এবারও ‘টেকসই বাংলাদেশ বিনির্মাণে চাই যুববান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থা’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক যুব দিবস বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পালন করে। দেশব্যাপী ৪৫টি সনাক অঞ্চল ও ঢাকার ১৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইয়ুথ এনগেজমেন্ট অ্যান্ড সাপোর্ট (ইয়েস) প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সচেতনতা ও প্রচারণামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

অনুষ্ঠানের শেষে সনাক মাদারীপুরের সহসভাপতি আন্না আক্তার সম্ভাবনাময় যুব জনগোষ্ঠীকে জাতীয় অর্জনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে টিআইবি ও তরুণ কর্মীদের পক্ষ থেকে নিম্নোক্ত সুপারিশগুলো উপস্থাপন করেন:

**প্রস্তাবিত সুপারিশসমূহ:**

১. বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি ও উদ্ভাবনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভাবে টেকসই বাংলাদেশ গঠনে সংশ্লিষ্ট অংশীদার ও বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করে একটি সুপরিকল্পিত ও সুনির্দিষ্ট যুব কৌশল প্রণয়ন করা হোক। স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হোক।

২. স্থানীয় উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় তরুণদের প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এর আওতায় ওয়ার্ড কমিটি, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে তরুণদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হোক। স্থানীয় ইউথ অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল গঠন করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হোক।

৩. রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্র ও যুব শাখার দৃষ্টিভঙ্গি ও কাঠামোগত মানসিকতা পুনর্বিন্যাস করে তরুণদের বাস্তব প্রত্যাশা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য ঘটানো হোক। কেন্দ্রীয় ও শাখা পর্যায়ের কমিটিতে তরুণদের যথাযথ ও অর্থবহ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হোক।

৪. রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি ও নীতিগত এজেন্ডায় শিক্ষা, কর্মসংস্থান, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তি, লৈঙ্গিক সমতা, মাদক নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি যুবকেন্দ্রিক ইস্যু অন্তর্ভুক্ত করা হোক। প্রান্তিক, গ্রামীণ, সংখ্যালঘু ও বৈচিত্র্যময় পরিচয় বহনকারী যুবসমাজের অন্তর্ভুক্তি ও প্রতিনিধিত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হোক।

৫. স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও তরুণদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে যৌথ কর্মসূচির মাধ্যমে অংশীদারিত্ব গঠন করা হোক। রাজনৈতিক দলগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তরুণদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ ও জবাবদিহিমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করুক।

৬. আন্তর্জাতিক শ্রম বাজারের চাহিদা অনুযায়ী তরুণদের কর্মমুখী শিক্ষা ও কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা হোক।

৭. আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও নারী শিক্ষার্থীদের বিশেষ প্রণোদনা প্রদানের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন দক্ষতা উন্নয়নমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করা হোক।

—

Facebook Comments Box