পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষায় নতুন করে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যবই পরিমার্জনের প্রস্তাবে বাংলা ভাষার প্রচলিত কিছু শব্দ, ইতিহাস ও সাহিত্য পাঠে একাধিক পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়েছে। এরই মধ্যে প্রস্তাবিত এসব পরিবর্তন ঘিরে রাজ্যের শিক্ষামহল ও নাগরিক সমাজে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা।

সিলেবাস কমিটির চেয়ারম্যান দেবাশিস চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে পাঠ্যবইয়ে ‘পানি’, ‘আব্বা’ ও ‘আম্মু’র মতো কিছু শব্দ আর রাখা হবে না। কমিটির যুক্তি, এসব শব্দ বর্তমানে খুব বেশি প্রচলিত নয় এবং এগুলোর ব্যবহার শ্রুতিমধুরও নয়। তবে সমালোচকদের একাংশের দাবি, এই পরিবর্তনের মাধ্যমে মুসলিম সমাজে বহুল ব্যবহৃত শব্দ ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের উপাদানগুলো ধীরে ধীরে পাঠ্যক্রম থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

প্রস্তাবিত নতুন বই আগামী বছরের ২ জানুয়ারির মধ্যে শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। শুধু ভাষা নয়, ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানেও আসছে গুরুত্বপূর্ণ রদবদল। দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যবইয়ের শুরুতে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবনী যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসের অংশ ছোট করার কথা জানানো হয়েছে। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় তথ্যটুকুই রাখা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

পাঠ্যক্রম থেকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক তৃণমূল সরকারের আমলের ‘সিঙ্গুর আন্দোলন’ ও ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্পের বিষয়বস্তুও। পাশাপাশি সাম্যবাদ বা কমিউনিজমকে আগের মতো গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন না করার বিষয়েও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। সিলেবাস কমিটির ভাষ্য, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা রাজনৈতিক চিন্তাধারাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরিবর্তে পাঠ্যক্রমকে নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে।

বাংলা সাহিত্যেও প্রস্তাবিত পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আফ্রিকা’ কবিতার পরিবর্তে ‘শিবাজী উৎসব’ অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ‘আফ্রিকা’ কবিতায় উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের প্রতিবাদী অবস্থান উঠে এসেছে। বিপরীতে ‘শিবাজী উৎসব’ কবিতায় শিবাজীকে কেন্দ্র করে জাতীয়তাবাদ ও ঐতিহাসিক চেতনার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

এ ছাড়া শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ‘সিরাজউদ্দৌলা’ নাটক বাদ দিয়ে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘মেবার-পতন’ অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ‘সিরাজউদ্দৌলা’ নাটকে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের বিষয়টি উঠে এসেছে। অন্যদিকে ‘মেবার-পতন’-এ রাজপুতদের বীরত্ব, আত্মত্যাগ ও মুঘলবিরোধী সংগ্রামের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে।

ফলে প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো কেবল পাঠ্যসূচি সংক্ষিপ্ত বা আধুনিকায়নের উদ্যোগ, নাকি এর মধ্য দিয়ে ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে নির্দিষ্ট একটি দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপনের চেষ্টা হচ্ছে—এ প্রশ্নও সামনে এসেছে। সমালোচকদের মতে, একটি বহুত্ববাদী সমাজের পাঠ্যক্রমে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভাষা, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক অবদানকে ভারসাম্যপূর্ণভাবে তুলে ধরা জরুরি।

তবে রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন জানিয়েছেন, বিষয়গুলো নিয়ে সিলেবাস কমিটির আলোচনা চলছে। ফলে প্রস্তাবিত পরিবর্তনের কোনগুলো শেষ পর্যন্ত পাঠ্যবইয়ে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।