চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ মেরামত কারখানায় প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের সংকট দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে। একটি লোকোমোটিভ সচল রাখতে অনেক সময় আরেকটি অচল ইঞ্জিন থেকে যন্ত্রাংশ খুলে ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে সাময়িকভাবে ইঞ্জিনটি লাইনে ফেরানো গেলেও কিছুদিন পর একই ত্রুটি নিয়ে সেটি আবার কারখানায় ফিরে আসছে। ফলে ‘রিপিট ফেইলিওর’-এর চক্রে বাড়ছে মেরামতের চাপ।
পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের মিটারগেজ লোকোমোটিভ মেরামতের অন্যতম প্রধান এই কারিগরি কেন্দ্রে অনুমোদিত ৩৩০টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ১১০ জন। দীর্ঘদিন নিয়োগ না হওয়া এবং অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ানদের অবসরের কারণে দক্ষ জনবলের সংকট তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে আমদানিনির্ভর স্পেয়ার পার্টসের ঘাটতি, বাজেট বরাদ্দ এবং ঋণপত্র (এলসি) সংক্রান্ত জটিলতা।
কারখানা-সংশ্লিষ্টরা জানান, কোনো যন্ত্রাংশের চাহিদাপত্র দেওয়ার পর প্রশাসনিক অনুমোদন, বাজেট বরাদ্দ ও ক্রয়প্রক্রিয়া শেষ করে সেটি হাতে পেতে কখনো কখনো এক বছরেরও বেশি সময় লেগে যায়। এ কারণে মেরামতের জন্য আসা অনেক লোকোমোটিভ দীর্ঘ সময় কারখানায় পড়ে থাকে। অন্যদিকে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত ইঞ্জিন লাইনে ফেরানোর চাপ থাকায় অনেক ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ ওভারহোলিংয়ের পরিবর্তে তাৎক্ষণিক মেরামত করে ইঞ্জিন চালু করা হয়।
শ্রমিকদের ভাষ্য, একটি ইঞ্জিনকে সচল রাখতে আরেকটি অচল ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ ব্যবহার এখন প্রায় নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে তাৎক্ষণিক সমাধান মিললেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ পর একই ধরনের ত্রুটি দেখা দিলে লোকোমোটিভটি আবার কারখানায় ফেরত আসে। এতে মেরামতের চাপ বাড়ার পাশাপাশি রেললাইনে প্রস্তুত লোকোমোটিভের সংখ্যাও কমে যায়, যার প্রভাব পড়ে সামগ্রিক ট্রেন পরিচালনায়।
জনবল সংকটের কারণে সীমিতসংখ্যক মেকানিক ও টেকনিশিয়ানকে অতিরিক্ত চাপ নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দৈনিক মজুরিভিত্তিক ও অদক্ষ শ্রমিকের সহায়তাও নিতে হচ্ছে। অথচ পুরোনো মিটারগেজ লোকোমোটিভের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও নির্ধারিত ওভারহোলিংয়ের জন্য অভিজ্ঞ কারিগরি জনবল প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে নানা সংকটের মধ্যেও পাহাড়তলী ডিজেল শপের সক্ষমতার প্রমাণ মিলেছে বড় ধরনের মেরামতের কাজে। গত চার অর্থবছরে কারখানাটি ১৫টি মৃতপ্রায় ও চারটি দুর্ঘটনাকবলিতসহ মোট ১৯টি লোকোমোটিভ মেরামত করে সম্পূর্ণ সচল অবস্থায় রানিং ডিভিশনে ফেরত পাঠিয়েছে। এর মধ্যে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চারটি মৃতপ্রায় ও দুটি দুর্ঘটনাকবলিত, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চারটি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাঁচটি মৃতপ্রায় ও দুটি দুর্ঘটনাকবলিত লোকোমোটিভ পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
শুধু বড় ধরনের মেরামত নয়, প্রতিদিনের ছোট-বড় ত্রুটিও সামলাতে হয় কারখানাটিকে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন থেকে চার বছরে প্রতিদিন গড়ে সাত থেকে আটটি লোকোমোটিভের মেরামত ও লাইট ওভারহোলিং করা হয়েছে। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার আগে বাড়তি ট্রেন পরিচালনার জন্য একসঙ্গে প্রায় ৪৫ থেকে ৫৫টি লোকোমোটিভ প্রস্তুত করে লাইনে পাঠানোর দায়িত্বও পালন করতে হয়েছে কারখানাটিকে।
এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম থেকে আমদানি করা ৩০০০ সিরিজের ২২টি আধুনিক লোকোমোটিভও বিভিন্ন সময়ে কারিগরি ত্রুটির কারণে পাহাড়তলী কারখানায় মেরামত করা হয়েছে।
জনবল ও যন্ত্রাংশের ঘাটতির মধ্যেও কারিগরি সক্ষমতা বাড়াতে অটোমেশন প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছে কারখানাটি। দেশীয় প্রযুক্তিতে স্বয়ংক্রিয় ডায়াগনস্টিকস এবং পার্টস ক্লিনিং ও ফিটিংয়ের জন্য অটোমেশন মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। ডায়াগনস্টিকস মেশিনের মাধ্যমে ইলেকট্রিক্যাল ও ফুয়েল সিস্টেমের ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। অন্যদিকে সিলিন্ডার হেড ও ক্র্যাঙ্কশ্যাফ্টের মতো ভারী যন্ত্রাংশ পরিষ্কার ও ফিটিংয়ের কাজও নতুন মেশিনের মাধ্যমে তুলনামূলক দ্রুত ও নির্ভুলভাবে করা যাচ্ছে।
এ ছাড়া দেশীয় প্রযুক্তিতে জিব ক্রেন, এসি মোটর টেস্টিং প্ল্যান্ট এবং কমপ্রেসর টেস্টিং প্ল্যান্টও স্থাপন করা হয়েছে। এতে সীমিত জনবল দিয়ে কাজের গতি বাড়ানোর পাশাপাশি মূল্যবান কর্মঘণ্টা সাশ্রয়ের চেষ্টা চলছে।
পাহাড়তলী ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ মেরামত কারখানার কর্মব্যবস্থাপক (ডিজেল) প্রকৌশলী এতেশাম মো. শফিক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দক্ষ জনবল ও মানসম্মত স্পেয়ার পার্টসের ঘাটতির কারণে কারখানার মেরামত কার্যক্রম চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। দক্ষ জনবলের সংকট মোকাবিলা এবং কর্মঘণ্টার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ধীরে ধীরে বিভিন্ন অটোমেশন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা প্ল্যান্ট ও মেশিনারিজের পাশাপাশি দেশীয় প্রযুক্তিতেও ডায়াগনস্টিক প্ল্যান্ট স্থাপন করা হচ্ছে। তবে বর্তমান প্রয়োজনের তুলনায় এসব ব্যবস্থা এখনও অপ্রতুল। সরঞ্জাম বিভাগ বাজেট ও এলসি-সংক্রান্ত জটিলতা কাটিয়ে আমদানি করা প্রয়োজনীয় মালামাল দ্রুত সরবরাহ করতে পারলে লোকোমোটিভ মেরামতের গতি আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।
কারখানা-সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড়তলী ডিজেল শপের দীর্ঘদিনের সংকট কাটাতে শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ালেই হবে না। দ্রুত শূন্য পদে দক্ষ জনবল নিয়োগ, অভিজ্ঞ মেকানিকদের জ্ঞান নতুন কর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া, আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণ, সময়মতো বাজেট বরাদ্দ এবং মানসম্মত স্পেয়ার পার্টস সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
কারণ একটি লোকোমোটিভ বারবার বিকল হয়ে কারখানায় ফিরে এলে তার প্রভাব শুধু ওই ইঞ্জিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এতে ট্রেনের সময়সূচি, যাত্রীসেবা এবং পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের সামগ্রিক লোকোমোটিভ ব্যবস্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই জোড়াতালি দিয়ে সাময়িক মেরামতের পরিবর্তে নির্ধারিত সময়ে পূর্ণাঙ্গ ওভারহোলিং এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করাই পাহাড়তলী ডিজেল শপের সক্ষমতা টেকসই করার প্রধান শর্ত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মন্তব্য করুন