নড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) হুমকি দেওয়ার অভিযোগে দলীয় পদ ও প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে সাময়িক বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা মতিউর রহমান সাগর নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। তার দাবি, ঘটনার প্রকৃত বিষয় সামনে না এনে তার বক্তব্যের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
বুধবার বিকেলে শরীয়তপুর শহরের চিকন্দী ফুড পার্কে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন নড়িয়া উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক পদে থাকা এই নেতা।
সাগর বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। বিগত সরকারের সময়ে গুম ও পুলিশের নির্যাতনের শিকার হওয়ার পাশাপাশি একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
সাম্প্রতিক ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে সাগর বলেন, গত ৫ অক্টোবর নড়িয়ার নোয়াদ্দা বাংলাবাজার এলাকায় তার ছবি ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ছবি-সংবলিত একটি বড় ব্যানার পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ খবর পেয়ে সেখানে গেলে কয়েকজনের সঙ্গে তার হাতাহাতি হয়। পরে স্থানীয় নেতা-কর্মী ও ব্যবসায়ীরা সালাম নামে একজনকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন।
সাগরের দাবি, ওই ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেপ্তার না করে ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিল। বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি নড়িয়া থানায় গিয়ে ওসির সঙ্গে উত্তেজিত অবস্থায় কথা বলেন। তবে তার বক্তব্যকে হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
সাগর বলেন, ‘আমি বলেছি, আগের ওসি অনেক আকাম-কুকাম করে এখান থেকে বিদায় হয়েছেন। আপনিও যদি তার মতো করেন, তাহলে আপনাকেও তার মতো চলে যেতে হবে।’
তার ভাষ্য, কথোপকথনের পুরো বিষয়টি বিবেচনা না করে বক্তব্যের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় ভুল-বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ, অসাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে মতিউর রহমান সাগরকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে শরীয়তপুর জেলা বিএনপি। জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ কামরুল হাসান স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সাগরের বিরুদ্ধে একাধিক দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ ও অসাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তাকে গত ২৮ জুলাই কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। পরে তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ প্রকাশ পাওয়ায় এবং দলীয় নীতি ও শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়ানোর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, তাকে নড়িয়া উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক পদসহ দলীয় প্রাথমিক সদস্যপদ ও অন্যান্য দায়িত্ব থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
সাগরের বিরুদ্ধে সর্বশেষ অভিযোগের সূত্রপাত হয় ৫ অক্টোবর নোয়াদ্দা বাংলাবাজার এলাকায় নির্বাচনী বিলবোর্ড স্থাপনকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিলবোর্ড স্থাপন নিয়ে জুলাই শহীদ মিরাজুল ইসলাম অর্ণবের বাবা আবু তালেবের সঙ্গে সাগরের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরে অর্ণবের চাচা আব্দুস সালাম সেখানে গেলে তাকে মারধর এবং ‘ফ্যাসিস্ট’ ও ‘যুবলীগ’ আখ্যা দিয়ে থানায় নেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। তবে এসব অভিযোগ সাগরের পক্ষ থেকে অস্বীকার করা হয়েছে।
ঘটনার পর নড়িয়া থানার ওসি আনোয়ার হোসেনকে উদ্দেশ করে সাগরের একটি বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘বাহার যে পথে গেছে, আপনিও যাবেন সে পথে।’ এ বক্তব্যকে কেন্দ্র করেই ওসিকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ সামনে আসে।
বিষয়টি নিয়ে নড়িয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহিউদ্দিন মিরাজ বলেন, ঘটনাটি দুঃখজনক। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে সাগরের বিরুদ্ধে অতীতেও সাংবাদিক, প্রশাসনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় তার বিরুদ্ধে নড়িয়া থানায় অন্তত ছয়টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
তবে সংবাদ সম্মেলনে নিজের অবস্থান তুলে ধরে সাগর বলেন, ‘দল আমাকে বহিষ্কার করেছে, তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। আমি অপরাধ করে থাকলে দল যে শাস্তি দেবে, তা মেনে নেব। তবে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা যাচাই করে আমার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হোক।’
সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি দলীয় সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্তের আহ্বান জানান।

মন্তব্য করুন