৩০ বছরের বেশি পুরোনো কোনো দলিল যথাযথ হেফাজত থেকে আদালতে উপস্থাপন করা হলে সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৯০ ধারার অধীনে আদালত দলিলটির সম্পাদন ও সত্যতা সম্পর্কে আইনগত অনুমান করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে দলিলের সম্পাদন প্রমাণের জন্য দলিলের সাক্ষীদের পৃথকভাবে আদালতে হাজির করা বাধ্যতামূলক নয়। তবে এ ধরনের অনুমান আদালতের বিবেচনাধীন এবং দলিলটি যথাযথ হেফাজত থেকে উপস্থাপনের শর্ত পূরণ করতে হবে।
একই সঙ্গে হাইকোর্ট বলেছেন, সংশ্লিষ্ট সময়ে কার্যকর আইনের বিধান অনুযায়ী ১০০ টাকার কম মূল্যের স্থাবর সম্পত্তির বিক্রয়মূল্য হলে এবং দখল হস্তান্তরের বিষয়টি প্রমাণিত হলে নিবন্ধন ছাড়াও বিক্রয় আইনগতভাবে কার্যকর হতে পারে।
এ ছাড়া জমির দখলে না থাকা কোনো বাদী কেবল স্বত্ব ঘোষণার প্রতিকার চেয়ে মামলা করলে, দখল পুনরুদ্ধারের মতো আরও প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা না চাইলে, সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ৪২ ধারার প্রোভাইসো অনুযায়ী মামলাটি আইনগত বাধার মুখে পড়তে পারে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক রায়ে এসব আইনগত বিষয় ব্যাখ্যা করেছেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি শেখ আবদুল আওয়াল ও বিচারপতি এ কে এম রাবিউল হাসানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ। আবদুল রেজ্জাক ভূঁইয়া ও অন্যান্য বনাম আবদুল হোসাইন খান ও অন্যান্য মামলায় ফার্স্ট আপিল নং ৭২১/২০১৮-এর রায়টি ১০ সেপ্টেম্বর ঘোষণা করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয় ১৮ অক্টোবর।
রায়ের মূল কথা হলো—পুরোনো দলিলের সত্যতা যাচাইয়ে সাক্ষ্য আইনের ৯০ ধারার শর্ত, সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের প্রযোজ্য বিধান এবং স্বত্ব ঘোষণার মামলায় যথাযথ প্রতিকার চাওয়ার বিষয়গুলো একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
মামলার বিরোধীয় সম্পত্তি মুন্সিগঞ্জের একটি মৌজায় অবস্থিত সিএস খতিয়ান নং ৭৭-এর সিএস দাগ নং ১২৪৬-এর ২১ শতাংশ জমি।
বাদীদের বক্তব্য ছিল, জমিটির মূল মালিক ইসব খাঁ। তার মৃত্যুর পর তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তিটির মালিক হন এবং পরবর্তী সময়ে তাদের উত্তরসূরিরা স্বত্ব অর্জন করেন। কিন্তু বিভিন্ন জরিপে তাদের কয়েকজনের নাম অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় তারা স্বত্ব ঘোষণার প্রতিকার চেয়ে মামলা করেন।
অন্যদিকে বিবাদীদের দাবি, ইসব খাঁ ১৯১৮ সালে ৮৫ টাকা মূল্যে জমিটি আমির ভূঁইয়া ওরফে ফেলু ভূঁইয়ার কাছে বিক্রি করেন এবং ক্রেতার অনুকূলে দখল হস্তান্তর করেন। পরবর্তী সময়ে সম্পত্তিটি নিয়ে ১৯২০ সালের একটি বন্ধকী দলিল এবং ১৯২৬ সালের একটি কবুলিয়ত দলিল সম্পাদিত হয়। বিবাদীপক্ষের পূর্বসূরিদের নামে পরবর্তী সময়ে এসএ ও আরএস খতিয়ানও প্রকাশিত হয়।
বাদীপক্ষ ১৯১৮ সালের বিক্রয় দলিলকে জাল ও বানোয়াট দাবি করে। বিপরীতে বিবাদীপক্ষ পুরোনো দলিলপত্র, দীর্ঘদিনের দখল এবং সরকারি রেকর্ডের ভিত্তিতে নিজেদের স্বত্বের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করে।
বিবাদীপক্ষ ১৯১৮, ১৯২০ ও ১৯২৬ সালের দলিলের পাশাপাশি ১৯২৪ সালের একটি নিবন্ধিত হেবা-বিল-এওয়াজ দলিলও আদালতে উপস্থাপন করে। ওই দলিল থেকে আদালত ইসব খাঁর পারিবারিক উত্তরাধিকার-সম্পর্কিত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। দলিল অনুযায়ী, ইসব খাঁর ছেলে আবদুল আজিজ তার পিতার জীবদ্দশায় মারা যান। আদালত তৎকালীন প্রযোজ্য মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের আলোকে আবদুল আজিজের ছেলে জুলমত খাঁর সরাসরি দাদার সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারসূত্রে অংশ পাওয়ার দাবির বিষয়টি বিবেচনা করেন।
রায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইনগত দিক হলো সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৯০ ধারার প্রয়োগ ও পরিধি। ধারাটির মূলনীতি অনুসারে, কোনো দলিল ৩০ বছরের বেশি পুরোনো হলে এবং তা আদালতের বিবেচনায় যথাযথ হেফাজত থেকে উপস্থাপিত হলে আদালত দলিলটির স্বাক্ষর, হাতের লেখা ও যথাযথ সম্পাদন সম্পর্কে অনুমান করতে পারেন। অর্থাৎ, দলিলের বয়স ও হেফাজতসংক্রান্ত শর্ত পূরণ হলে তার সম্পাদন প্রমাণের জন্য প্রত্যেক সাক্ষীকে পৃথকভাবে হাজির করার আনুষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতা থাকে না।
তবে এ বিধানকে দলিলের সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত ও খণ্ডন-অযোগ্য ঘোষণা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। আদালত দলিলের প্রকৃতি, সংরক্ষণের পরিস্থিতি, উপস্থাপনের উৎস এবং মামলার অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে আইনগত অনুমান প্রয়োগ করবেন।
এ প্রসঙ্গে হাইকোর্ট অ্যাডিশনাল ডেপুটি কমিশনার (রেভিনিউ) বনাম মো. রিয়াজুদ্দিন পিকে ও অন্যান্য, ৫ বিএলসি (এডি) ৭৬ মামলায় প্রতিষ্ঠিত নীতির উল্লেখ করেন। ওই নীতির আলোকে যথাযথ হেফাজত থেকে উপস্থাপিত ৩০ বছরের বেশি পুরোনো দলিলের ক্ষেত্রে সাক্ষ্য আইনের ৯০ ধারায় সত্যতা ও যথাযথ সম্পাদন সম্পর্কে অনুমান করার সুযোগ রয়েছে।
বর্তমান মামলায় ১৯২০ ও ১৯২৬ সালের দলিলগুলো সরকারি রেজিস্ট্রেশন ভলিউম বা বালাম বইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, শতবর্ষের কাছাকাছি পুরোনো দলিলে বাংলা ও ইংরেজি তারিখের মধ্যে সামান্য অসঙ্গতি থাকলেই দলিলটিকে জাল বলে গণ্য করা যায় না। এ ধরনের বিচ্ছিন্ন বা সামান্য অসঙ্গতি, অন্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণের মূল্যায়ন ছাড়াই, সাক্ষ্য আইনের ৯০ ধারার অধীনে উদ্ভুত আইনগত অনুমান খণ্ডনের জন্য যথেষ্ট নয়।
মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল ১৯১৮ সালের বিক্রয় দলিলের আইনগত কার্যকারিতা। দলিলে জমির বিক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছিল ৮৫ টাকা, যা সংশ্লিষ্ট সময়ে প্রযোজ্য ১০০ টাকার সীমার নিচে ছিল। আদালত তৎকালীন সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর ৫৪ ধারার বিধান বিবেচনায় নেন। উক্ত বিধানের তৎকালীন প্রযোজ্য রূপ অনুযায়ী, ১০০ টাকা বা তার বেশি মূল্যের স্থাবর সম্পত্তির বিক্রয়ের ক্ষেত্রে নিবন্ধিত দলিলের প্রয়োজনীয়তা ছিল। অন্যদিকে ১০০ টাকার কম মূল্যের স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে দখল হস্তান্তরের মাধ্যমে বিক্রয় সম্পন্ন করার আইনগত সুযোগ ছিল।
ফলে সংশ্লিষ্ট সময়ের আইন, দলিলে উল্লিখিত বিক্রয়মূল্য এবং দখল হস্তান্তরের প্রমাণ একত্রে বিবেচনা করে আদালত বিক্রয়টির আইনগত কার্যকারিতা মূল্যায়ন করেন। এ ক্ষেত্রে শুধু দলিলটি নিবন্ধিত ছিল কি না, সেই প্রশ্নের ভিত্তিতে বিক্রয়কে অকার্যকর ঘোষণা করা যথাযথ নয়। তবে এ পর্যবেক্ষণ সংশ্লিষ্ট সময়ের আইন ও মামলার নির্দিষ্ট তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে প্রযোজ্য; বর্তমান আইনে সব ধরনের স্থাবর সম্পত্তির বিক্রয়ের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য—এমন সিদ্ধান্ত এ থেকে নেওয়া যায় না।
রায়ে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ৪২ ধারার প্রোভাইসোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। আইনটির মূলনীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি সম্পত্তির স্বত্বের ঘোষণা চাওয়ার অধিকারী হলেও তিনি যদি ঘোষণার অতিরিক্ত কার্যকর কোনো প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ পান এবং সেই প্রতিকার চাইতে ব্যর্থ হন, তাহলে আদালত কেবল স্বত্ব ঘোষণার ডিক্রি দিতে পারেন না। বিশেষত, বাদী যদি সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির দখলে না থাকেন এবং দখল পুনরুদ্ধারের প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ থাকে, তাহলে শুধু স্বত্ব ঘোষণার মামলা যথেষ্ট নাও হতে পারে।
এ মামলায় আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, বাদীপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে বিরোধীয় জমির দখলের বাইরে ছিলেন। তা সত্ত্বেও তারা দখল পুনরুদ্ধারের প্রতিকার না চেয়ে কেবল স্বত্ব ঘোষণার মামলা করেন। প্রায় ৯০ বছর পর, ২০০৯ সালে, তারা ১৯১৮ ও ১৯২০ সালের লেনদেনকে চ্যালেঞ্জ করেন। এ পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় পরবর্তী প্রতিকার না চাওয়ার কারণে মামলাটি আইনগতভাবে টেকসই ছিল না বলে আদালত বিবেচনা করেন।
সামগ্রিক তথ্য, দলিলপত্র, দখলের ইতিহাস, সরকারি রেকর্ড এবং প্রযোজ্য আইন পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট মনে করেন, বিচারিক আদালত মামলার প্রমাণ ও পরিস্থিতি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে আইনগতভাবে টেকসই নয়—এমন ডিক্রি দেওয়া হয়েছিল।
এ কারণে হাইকোর্ট ফার্স্ট আপিল নং ৭২১/২০১৮ মঞ্জুর করেন এবং মুন্সিগঞ্জের যুগ্ম জেলা জজ, প্রথম আদালতের টাইটেল স্যুট নং ১৮৭/২০০৯ মামলায় ২০১৭ সালের ৮ জানুয়ারি দেওয়া রায় ও ডিক্রি বাতিল করেন। আপিলটি ১ থেকে ১৪ নম্বর বিবাদীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভিত্তিতে এবং অন্যদের বিরুদ্ধে একতরফাভাবে মঞ্জুর করা হয়।
রায়টি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিকে পুনর্ব্যক্ত করে
প্রথমত, যথাযথ হেফাজত থেকে উপস্থাপিত ৩০ বছরের বেশি পুরোনো দলিলের ক্ষেত্রে সাক্ষ্য আইনের ৯০ ধারায় আইনগত অনুমানের সুযোগ রয়েছে; ফলে প্রতিটি ক্ষেত্রে দলিলের সাক্ষীদের হাজির করেই সম্পাদন প্রমাণ করতে হবে—এমন বাধ্যবাধকতা নেই।
দ্বিতীয়ত, দলিলের বয়স, সংরক্ষণের উৎস, সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ বিবেচনা না করে শুধু সামান্য তারিখগত অসংগতি থেকে জালিয়াতির সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়।
তৃতীয়ত, কোনো পুরোনো সম্পত্তি হস্তান্তরের বৈধতা নির্ধারণে দলিল সম্পাদনের সময় কার্যকর আইন, বিক্রয়মূল্য এবং দখল হস্তান্তরের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।
সবশেষে, স্বত্ব ঘোষণার মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে বাদীর দখলগত অবস্থান এবং প্রয়োজনীয় পরবর্তী প্রতিকার চাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইন অনুযায়ী অতিরিক্ত প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা না চাইলে কেবল স্বত্ব ঘোষণার দাবি মামলার গ্রহণযোগ্যতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

মন্তব্য করুন