একটি সভ্য ও প্রগতিশীল সমাজে সাংবাদিকের পেশাগত দায়িত্ব অত্যন্ত স্পষ্ট—সত্য উন্মোচন করা, অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপরাধচক্রের অন্ধকার দিকগুলো জনসমক্ষে ফুটিয়ে তোলা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সাংবাদিকতা কি দিন দিন এক মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় পরিণত হচ্ছে? সত্যের সন্ধান করতে গিয়ে যখন একজন গণমাধ্যমকর্মীকে বুকে বুলেট নিয়ে প্রাণ হারাতে হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের সুরক্ষার চাদরটি কতটা ভঙ্গুর?
সম্প্রতি নেত্রকোনার দুর্গাপুরে অনুসন্ধানী সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের নির্মম হত্যাকাণ্ড সেই পুরোনো আশঙ্কার ক্ষতটিকেই নতুন করে উসকে দিয়েছে। সীমান্ত ঘেঁষা এলাকাগুলোর চোরাচালান ও নানা অপরাধমূলক সিন্ডিকেটের ভেতরের তথ্য প্রকাশ্যে আনতে তিনি অনন্য সাহসিকতা দেখাতেন। অনুসন্ধানের স্বার্থে কখনো ফেরিওয়ালা, কখনো মুচি, এমনকি মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন ছদ্মবেশ ধারণ করতেও তিনি পিছপা হননি। তাঁর এই আপসহীন কলম ও অনুসন্ধান স্বভাবতই আঁধার জগতের অপরাধী চক্রগুলোর কায়েমি স্বার্থে আঘাত হেনেছিল।
এর আগেও তাঁর ওপর হামলা হয়েছিল। এমনকি জীবন সংশয়ের আশঙ্কায় তিনি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে নিরাপত্তাও চেয়েছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সেই আশঙ্কার কোনো কার্যকর সমাধান হয়নি। গত ১৫ অক্টোবর রাতে সন্ত্রাসীদের গুলিতে শেষ হয়ে যায় এক নির্ভীক সত্যসন্ধানীর জীবন। আশঙ্কাজনিত সুরক্ষার আকুতি সত্ত্বেও প্রশাসনের এই নীরবতা বা ব্যর্থতা সাংবাদিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থার কঙ্কালসার চিত্রটিই উন্মোচন করে।
সত্য প্রকাশ করা কি কোনো অপরাধ? যদি তা না হয়, তবে সেই সততার বিনিময় কেন রক্ত দিয়ে শোধ করতে হবে? যে রাষ্ট্র বা সমাজ তার নাগরিক কিংবা সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা একজন কলমযোদ্ধাকে কাজের ন্যূনতম নিরাপদ পরিবেশ দিতে পারে না, সেখানে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা কতটা সঙ্গত?
সংবাদমাধ্যমকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ হিসেবে গণ্য করা হয়। অথচ সেই স্তম্ভ যদি আঘাতের পর আঘাতে ধসে পড়তে থাকে, তবে মুক্ত চিন্তার ভবিষ্যৎ অন্ধকারে তলিয়ে যেতে বাধ্য। আলিফ হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাগুলোতে যদি বিচারে বিলম্ব হয় কিংবা অপরাধীরা পার পেয়ে যায়, তবে ভবিষ্যতে কোনো সাংবাদিক অপরাধী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পাবেন না। ফলস্বরূপ, গডফাদারদের দৌরাত্ম্য কেবল বাড়তেই থাকবে।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই না, যেখানে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোটাই জীবনের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ তদন্ত ও অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের জোর দাবি। এর পাশাপাশি দেশের প্রতিটি সাংবাদিক যাতে নির্ভয়ে ও স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রেরই প্রধান দায়িত্ব।

মন্তব্য করুন