জন্ম থেকেই দুই হাত নেই। তবে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কিংবা আর্থিক সংকট—কোনোটিই থামাতে পারেনি জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার শিবপুর গ্রামের বিউটি খাতুনকে। পায়ের আঙুলে কলম ধরে পড়াশোনা চালিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন তিনি। এবার তাঁর লক্ষ্য বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিচারক হওয়া।
বিউটি খাতুনের জন্ম একটি দরিদ্র কৃষক পরিবারে। তাঁর বাবা বাইজিদ হোসেন ক্ষুদ্র কৃষক এবং মা রহিমা বিবি গৃহিণী। জন্মের পর থেকেই মেয়ের দুই হাত না থাকায় দুশ্চিন্তায় ছিলেন মা-বাবা। তবে ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ছিল বিউটির। মেয়ের আগ্রহ দেখে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও তাঁকে পড়াশোনা করানোর সিদ্ধান্ত নেন বাবা।
বিদ্যালয়ে পড়ার সময় নানা উপহাস ও নেতিবাচক মন্তব্যের মুখোমুখি হতে হয়েছে বিউটিকে। তবে এসব বাধা তাঁর মনোবল আরও দৃঢ় করেছে। স্থানীয় মাদ্রাসায় প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর শামপুর হাই স্কুল থেকে এসএসসি এবং উপজেলা পর্যায়ের একটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন তিনি। পরে নিজের মেধা ও আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিদের সহযোগিতায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তির সুযোগ পান।
দৈনন্দিন কাজেও স্বাবলম্বী
শুধু পড়াশোনাই নয়, দৈনন্দিন কাজেও দক্ষ বিউটি। দুই হাত না থাকলেও পা ব্যবহার করে ভাত রান্না করা ও সবজি কাটাসহ নিজের প্রয়োজনীয় অনেক কাজই করতে পারেন তিনি। শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে এভাবে নিজের জীবন পরিচালনা করছেন এই শিক্ষার্থী।
লক্ষ্য বিচারক হওয়া
স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর এখন বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের (বিজেএস) পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিউটি। কারও দয়া বা করুণার ওপর নির্ভর না করে নিজের যোগ্যতায় সিভিল জজ হতে চান তিনি।
নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বিউটি খাতুন বলেন, “আমি নিজের পায়ে প্রতিষ্ঠিত হতে চাই। প্রতিবন্ধকতা মানেই যে সমাজের বোঝা নয়, আমি তা প্রমাণ করতে চাই। আমি প্রতিষ্ঠিত হয়ে সমাজে আমার মতো যারা শারীরিক ও মানসিকভাবে অবহেলিত ও হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছে, তাদের পাশে দাঁড়াতে চাই এবং তাদের কল্যাণে কাজ করতে চাই।”
মেয়ের এমন সাফল্যে আনন্দিত ও গর্বিত তাঁর মা-বাবা ও এলাকাবাসী। বাবা বাইজিদ হোসেন বলেন, “বহু কষ্ট করে মেয়েটাকে পড়ালেখা করিয়েছি। সে একটা ভালো চাকরি পেলে আমার সব দুঃখ ঘুচে যাবে।”
বিউটির এই অর্জন তাঁর পরিবারের পাশাপাশি এলাকার মানুষের মধ্যেও আশার সঞ্চার করেছে। উচ্চশিক্ষা অর্জনের পর এবার বিচারক হওয়ার স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে যেতে চান তিনি। নিজের যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে তাঁর মতো অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোই এখন বিউটির অন্যতম লক্ষ্য।

মন্তব্য করুন