খুলনার তেরখাদা উপজেলায় আদালতের সিল ও স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া ‘ইনফরমেশন স্লিপ’ তৈরির মাধ্যমে বিরোধপূর্ণ ১৬ শতক জমি নিজেদের নামে নামজারি করানোর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সাতজনের বিরুদ্ধে তেরখাদার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নালিশি মামলা করেছেন জমির দাবিদার এফএম হাবিবুর রহমান। এর আগে জালিয়াতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট নামজারি মামলা বাতিল করে উপজেলা ভূমি অফিস।
যেভাবে শুরু জমি নিয়ে বিরোধ
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, তেরখাদা মৌজার সিএস ২৪৬ ও এসএ ৩৭২ নম্বর খতিয়ানের ৪১৪ নম্বর দাগের, সর্বশেষ বিএস ৬৩৯ খতিয়ানের ১১৮৬ নম্বর দাগভুক্ত ১৬ শতক জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। বাদী এফএম হাবিবুর রহমানের দাবি, তাঁর বাবা মৃত ইয়াকুব আলী ফকির ও গোলাম মোস্তফা ফকির ওই সম্পত্তির বৈধ মালিক ও ভোগদখলকারী ছিলেন।
জমির মালিকানা দাবি করে প্রতিপক্ষ ১৯৯৪ সালে তেরখাদার সহকারী জজ আদালতে দেওয়ানি মামলা করে। নিম্ন আদালতে মামলাটি খারিজ হওয়ার পর জেলা জজ আদালতে আপিল করা হয়। পরবর্তী সময়ে ওই রায় ও ডিক্রির বিরুদ্ধে হাইকোর্ট বিভাগে সিভিল রিভিশন দায়ের করা হয়, যা এখনো বিচারাধীন।
আদালতের সিল-স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগ
বাদীপক্ষের অভিযোগ, হাইকোর্টে রিভিশন মামলা চলমান থাকা অবস্থায় আসামিরা মামলার তথ্য গোপন করে পরস্পর যোগসাজশে জালিয়াতির আশ্রয় নেন। আদালতের সিল ও স্বাক্ষর জাল করে ‘হাইকোর্ট ফরম নম্বর (এম)-৫৫’-এর আদলে একটি ভুয়া ইনফরমেশন স্লিপ তৈরি করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই স্লিপে ২০২২ সালের ২২ জুন তারিখ উল্লেখ করে দরখাস্তকারী হিসেবে ‘আঃ সাত্তার, খুলনা জজ কোর্ট’-এর নাম ব্যবহার করা হয়। পরে জাল কাগজপত্র তেরখাদা উপজেলা ভূমি অফিসে ২৪৯/২০২৬-২৭ নম্বর নামজারি মামলায় দাখিল করে ১৬ শতক জমি নিজেদের নামে নামজারি করিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন বাদী।
ভূমি অফিসে নামজারি বাতিল
বিষয়টি জানতে পেরে এফএম হাবিবুর রহমান উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর নামজারি মামলার বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করেন। নথিপত্র পর্যালোচনা শেষে গত ১৮ আগস্ট নামজারি মামলাটি বাতিল করেন তেরখাদার সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম নুরুন্নবী।
এ বিষয়ে এস এম নুরুন্নবী জানান, নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, জমিটি নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। অথচ সেই তথ্য গোপন করে নামজারি করা হয়েছিল। এ ছাড়া দাখিল করা ইনফরমেশন স্লিপেও গুরুতর অসংগতি পাওয়া যায়। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নিয়ম অনুযায়ী নামজারি মামলাটি বাতিল করা হয়েছে।
নামজারি মামলার মাধ্যমে তৈরি হওয়া নতুন খতিয়ান বাতিলের জন্যও পৃথক আবেদন করেছেন বাদী।
সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা
মামলার আসামিরা হলেন বিকাশ কান্তি পাত্র (৫০), পলাশ কুমার পাত্র (৫০), সুমন পাত্র (৪৪), শিখা রানী পাত্র (৪৮), প্রমীলা বালা পাত্র (৫০), লিপিকা রানী পাত্র (৪৭) ও সমীর কুমার সাহা (৬০)। এ ছাড়া মামলায় কয়েকজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, গত ১৩ সেপ্টেম্বর থানায় মামলা করতে গেলে বাদীকে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে মঙ্গলবার তিনি আদালতে নালিশি মামলা দায়ের করেন। মামলায় দণ্ডবিধির ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারায় অভিযোগ এনে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করা হয়েছে। তেরখাদার সহকারী কমিশনার (ভূমি)সহ স্থানীয় কয়েকজনকে মামলায় সাক্ষী করা হয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার অভিযুক্তের
অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত বিকাশ কান্তি পাত্র বলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আনা জালিয়াতির অভিযোগ সঠিক নয়। এ নিয়ে হাইকোর্টে মামলা চলমান রয়েছে। প্রতিপক্ষের একজনের মাধ্যমেই তাঁরা জমিটি নিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
মামলাটি বর্তমানে আদালতের বিচারাধীন। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

মন্তব্য করুন