মেধাবী সন্তান এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে—এমন খবরে যে পরিবারে আনন্দ-উচ্ছ্বাস আর মিষ্টি বিতরণের ধুম লাগার কথা ছিল, সেই বাড়িতেই আজ বাজছে কান্নার রোল। কপালে জিপিএ-৫-এর সাফল্য জুটলেও তা দেখার জন্য বেঁচে নেই মেধাবী ছাত্র রাকিবুল ইসলাম (রাকিব)। হত্যাকাণ্ডের পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে জীবিত দেখিয়ে মুক্তিপণ আদায়ের শিকার হওয়া সেই রাকিবের ফলাফলের দিনে টাঙ্গাইলের গোপালপুরের বাড়িতে মিষ্টির বদলে আয়োজন করা হয়েছে কুলখানি ও দোয়ার।

টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার দাদির আটা গ্রামের খাদেমুল ইসলামের ছেলে রাকিবুল ইসলাম ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এ বছর এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। শনিবার প্রকাশিত ফলাফলে তিনি জিপিএ-৫ অর্জন করেন। কিন্তু এই অসামান্য অর্জনের দিনে তিনি আর বাড়ি ফেরেননি, কোনো দিন ফিরবেনও না।

রোজ রোববার রাকিবদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক করুণ দৃশ্য। যে টেবিলে বসে নিয়মিত পড়াশোনা করতেন রাকিব, সেখানে এখনো গোছানো রয়েছে তাঁর বই-খাতা ও ব্যবহৃত জিনিসপত্র। পাশে শোভা পাচ্ছে তাঁর বাঁধাই করা ছবি আর ঝুলিয়ে রাখা অর্জিত নানা পুরস্কার। ছেলে ব্যারিস্টার হয়ে মা-বাবার মুখ উজ্জ্বল করবে—এমন স্বপ্ন নিয়ে এইচএসসি পরীক্ষা শেষেই ভর্তি প্রস্তুতির জন্য ঢাকায় গিয়েছিলেন রাকিব। শৈশব থেকেই অত্যন্ত মেধাবী এই শিক্ষার্থী তাঁর স্কুলজীবনে মোট ছয়টি বৃত্তি পেয়েছিলেন।

রাকিবের বাবা খাদেমুল ইসলাম অশ্রুসজল চোখে বলেন, “আমার ছেলের অনেক স্বপ্ন ছিল ব্যারিস্টার হওয়ার। শৈশব থেকেই ও পড়ার টেবিলে দিনরাত পরিশ্রম করত। ঘাতকেরা আমার ছেলের সব স্বপ্ন শেষ করে দিল। আমি সরকারের কাছে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত আসামিদের ফাঁসি চাই।”

ছেলেকে হারিয়ে পাগলপ্রায় মা জোহরা বেগম বলেন, “অনেক কষ্টে ছেলেকে মানুষ করেছিলাম। প্রতিটি পরীক্ষায় ও ক্লাসে প্রথম হতো। আশা ছিল বড় হয়ে দেশের সেবা করবে। যারা আমার কোল খালি করেছে, আমি তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।”

ভাতিজার এমন সাফল্যে আনন্দের বদলে কুলখানির আয়োজন করার কথা জানিয়ে চাচা রফিকুল ইসলাম ও বড় ভাই জহুরুল ইসলাম আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, আজ রাকিব বেঁচে থাকলে সারা গ্রাম মিষ্টি খাওয়াত। কিন্তু সেই পরিস্থিতিতে পরিবার নেই। তাই রাকিবের আত্মার শান্তির উদ্দেশ্যে এতিম শিশুদের খাবার খাওয়ানো ও দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে।

মামলার নথি ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকায় রাকিবকে নির্মমভাবে হত্যা করে ঘাতক আব্দুল্লাহ মামুন। এরপর পরিবারকে বিভ্রান্ত করতে ও টাকা হাতিয়ে নিতে এআই (Artificial Intelligence) প্রযুক্তির মাধ্যমে রাকিবের চেহারায় ভিডিও তৈরি করে পরিবারের কাছে পাঠানো হয়। ছেলে জীবিত আছে ভেবে রাকিবের পরিবার ঘাতকদের চার লাখ টাকা মুক্তিপণ পাঠায়। কিন্তু টাকা নিয়েও রাকিবকে আর ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে নীলফামারীর ডিমলা থেকে পুলিশ তাঁর হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার করে এবং অভিযুক্ত আব্দুল্লাহ মামুনকে গ্রেপ্তার করে।

এদিকে ঘটনার এতদিন পার হয়ে গেলেও মামলার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন স্বজনেরা। অবিলম্বে দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসী।