খুলনায় যোগদানের পর থেকেই সিভিল সার্জন ডা. মো. মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম ও একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ কোনো ধরনের পূর্বনোটিশ ছাড়াই জেলার বিভিন্ন সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ২৬৯ জন আউটসোর্সিং কর্মচারীকে অব্যাহতি দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ ১৫ মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধ না করেই তাঁদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এতে কর্মচারীদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারগুলোও চরম আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ অক্টোবর খুলনার সিভিল সার্জন হিসেবে যোগদান করেন ডা. মো. মনিরুজ্জামান। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১৩ দিনের মাথায় ২৬ অক্টোবর জারি করা এক অফিস আদেশে সিভিল সার্জন কার্যালয়সহ তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের আউটসোর্সিং কর্মচারীদের অব্যাহতি দেওয়া হয়।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁদের কোনো ধরনের পূর্বনোটিশ দেওয়া হয়নি। এমনকি সংশ্লিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের মতামতও নেওয়া হয়নি। একক সিদ্ধান্তে এমন পদক্ষেপ নেওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের জন্য সরকার অর্থ বরাদ্দ দিলেও তাঁদের পাওনা পরিশোধ করা হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট ড্রয়িং অ্যান্ড ডিসবার্সিং অফিসারদের (ডিডিও) বেতন পরিশোধে মৌখিকভাবে নিরুৎসাহিত বা বাধা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে সিভিল সার্জনের বিরুদ্ধে। ফলে দীর্ঘ ১৫ মাস ধরে বেতন না পাওয়া কর্মচারীরা আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, একদিকে বকেয়া বেতন না পাওয়া, অন্যদিকে হঠাৎ চাকরি থেকে অব্যাহতি—দুই সংকটে তাঁরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। ২৬৯ কর্মচারীর পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের সদস্যদের জীবনযাপনও কঠিন হয়ে উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আউটসোর্সিং কর্মচারীরা বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তাসহ গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের হঠাৎ সরিয়ে দেওয়ায় হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব সিদ্ধান্তের প্রশাসনিক কারণ এবং কর্মচারীদের অব্যাহতির বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

**বরিশালে দায়িত্ব পালনকালেও অভিযোগের দাবি**

এর আগে বরিশালে দায়িত্ব পালনকালেও ডা. মো. মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের ভাষ্য, গৌরনদী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তাঁর বিরুদ্ধে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় আহত ছাত্র-জনতাকে চিকিৎসাসেবা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ওই সময় এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয় এবং তাঁর কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ করা হয়েছিল বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।

পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের ২১ জুলাই বরিশালের সিভিল সার্জন হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ডা. মো. মনিরুজ্জামান। তবে একই বছরের ২ আগস্ট তাঁকে ওই পদ থেকে প্রত্যাহার করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বদলি করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, ছাত্র-জনতার অসন্তোষের মুখে তাঁকে ওই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যদিও প্রত্যাহারের প্রশাসনিক কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে খুলনায় যোগদানের পর আউটসোর্সিং কর্মচারীদের অব্যাহতি এবং বকেয়া বেতন পরিশোধ না করার অভিযোগে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা দ্রুত বকেয়া বেতন পরিশোধ, অব্যাহতির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা এবং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

তাঁদের মতে, সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মচারীদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত বিধিবিধান ও মানবিক দিক বিবেচনা করা প্রয়োজন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে খুলনার সিভিল সার্জন ডা. মো. মনিরুজ্জামানের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।