চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলায় ফেলে দেওয়া আমের খোসা প্রক্রিয়াজাত করে চা তৈরি করছেন তিন বন্ধু। ‘ম্যাংগো পিল টি’ নামের এই চায়ের কেজিপ্রতি বাজারমূল্য প্রায় ৪ হাজার টাকা বলে জানিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা।
উদ্যোগটির নেতৃত্বে আছেন মো. মইনুল ইসলাম। সঙ্গে আছেন মো. মিঠু ও মাসুম পান্না। ভোলাহাটের বজরাটেক এলাকায় ‘সবুজ খামার’ নামে তাঁদের প্রতিষ্ঠানে ড্রাই ম্যাংগোসহ আম প্রক্রিয়াজাত পণ্য তৈরি হয়। এসব পণ্য তৈরির পর খোসা ফেলে দেওয়া হতো। সেই উচ্ছিষ্ট কাজে লাগানোর ভাবনা থেকেই চা তৈরির পরিকল্পনা করেন তাঁরা।
মইনুল ইসলাম বলেন, লেখাপড়া শেষ করে চাকরির পেছনে না ছুটে তিনি এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। আম প্রক্রিয়াজাতের পর খোসা কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেই চিন্তা থেকেই ‘ম্যাংগো পিল টি’ তৈরির যাত্রা শুরু।
মিঠু জানান, আমচাষি পরিবারের সন্তান হিসেবে ছোটবেলা থেকেই আমের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। কয়েক বছর ধরে আমের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চাষিদের দুর্ভোগ তিনি কাছ থেকে দেখেছেন। আমকে কাজে লাগিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার ভাবনা থেকেই এই উদ্যোগ। শুরুতে কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকলেও ক্রেতাদের ভালো সাড়া পাচ্ছেন বলে জানান তিনি।
জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায় সবচেয়ে বেশি আম উৎপাদন হয়। উপজেলার প্রায় ১০০ বিঘা জমিতে আম চাষ করেন রনি মিঞা। তিনি বলেন, দিন দিন আমের দাম কমছে। মৌসুমি আমের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চাষিদের প্রায়ই লোকসান গুনতে হয়। ভোলাহাটের এই উদ্যোগ বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারিত হলে আমের খোসার বাজার তৈরি হবে এবং চাষিরা বাড়তি আয়ের সুযোগ পাবেন বলে আশা তাঁর।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল আজিজ জানান, দিন দিন চায়ের চাহিদা বাড়ছে। আমের খোসা থেকে তৈরি এই চায়ুরও ভালো বাজার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি নিজে এই চা পান করে দেখেছেন; এতে চায়ের স্বাভাবিক স্বাদের পাশাপাশি আমের ঘ্রাণ পাওয়া যায়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পল্লী উন্নয়ন বিভাগের গবেষক শারজানা আক্তার সাবা বলেন, কয়েক বছর ধরে আমের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে চাষিরা লোকসানের মুখে পড়ছেন। উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম মিলছে না। এমন পরিস্থিতিতে আমের খোসার মতো উপজাত কাজে লাগিয়ে চা তৈরির উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।
তিনি আরও বলেন, শুধু উদ্যোগ গ্রহণ করলেই হবে না; টেকসই ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণে উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। আর্থিক সহায়তা, আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও বাজারজাতকরণে সহযোগিতা পেলে এ ধরনের চা বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন সম্ভব।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্ভিদ সংরক্ষণ) আমির আবদুল্লাহ মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, আম প্রক্রিয়াজাতের পর উৎকৃষ্ট মানের অনেক খোসাই ফেলে দেওয়া হয়। সেই খোসা ব্যবহার করে তৈরি চায়ের বাজারমূল্য কেজিপ্রতি প্রায় ৪ হাজার টাকা। এটি কৃষিপণ্যের অপচয় রোধ ও মূল্য সংযোজনের সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। উদ্যোক্তারা এগিয়ে এলে কৃষি বিভাগ তাদের পাশে থাকবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. শরফ উদ্দিন বলেন, বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার আগে চায়ের পুষ্টিমান, খাদ্যগুণ ও নিরাপত্তা পরীক্ষা জরুরি। এসব নিশ্চিত করা গেলে আমের খোসা থেকে তৈরি চা নতুন পণ্যের বাজার তৈরি করবে এবং চাষি ও উদ্যোক্তা উভয়ের জন্যই আয়ের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।




মন্তব্য করুন