শরীয়তপুরের নতুন পুলিশ সুপার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এমন এক সময়ে, যখন দেশের অন্যান্য জেলার মতো এখানেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মাদক নিয়ন্ত্রণ, কিশোর অপরাধ, সড়ক নিরাপত্তা এবং তথ্যপ্রবাহের সংকট একসঙ্গে চাপে ফেলছে সমাজকে। তার ওপর আছে আধুনিক প্রশাসনের নতুন চ্যালেঞ্জ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা।
এই তিনটি ইস্যু আজ শুধু আলাদা করে দেখা প্রযোজ্য নয়; বরং পরস্পর গভীরভাবে সম্পর্কিত। মাদক রোধে পুলিশ সফল হতে চাইলে সাংবাদিকদের মুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা উন্নত করতে হলে সমাজকে সঙ্গে নিতে হয়, আর সমাজকে সঙ্গে নেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হচ্ছে গণমাধ্যম।

সুতরাং নবাগত পুলিশ সুপার রওনক জাহানের সামনে দায়িত্বের পাশাপাশি একটি বিশাল সম্ভাবনার দরজাও খুলে গেছে। তার পদক্ষেপ এই জেলার গতিপথকে নতুনভাবে নির্ধারণ করতে পারে।

শরীয়তপুরসহ দেশের বহু জেলাতেই মাদক ব্যবসা দিন দিন আরও সংগঠিত হচ্ছে। ইয়াবা, আইস, গাঁজা, ফেন্সিডিল যে, নামেই আসুক, মাদক একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ ধ্বংস থেকে শুরু করে সমাজের ভিত কাঁপিয়ে দেয়।

মাদকের প্রভাবে কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠে, চুরি–ডাকাতি বাড়ে, পারিবারিক সহিংসতা ছড়ায়, এমনকি রাজনৈতিক অপরাধের সঙ্গে মাদক জড়িয়ে পড়ে।

একজন পুলিশ সুপারের কাছে মাদক নিয়ন্ত্রণ হলো সবচেয়ে কঠিন এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে জরুরি লড়াই।

নবাগত পুলিশ সুপার ইতিমধ্যে বলেছেন—সমাজকে নিরাপদ করতে হলে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
এ বক্তব্যে দৃঢ়তা আছে, আছে দায়িত্ববোধও।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, শুধু অভিযান বা গ্রেফতার দিয়ে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মাদক ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক শনাক্তকরণ

সামাজিক সচেতনতা জোরদার, মাদক পুনর্বাসন কার্যক্রম বৃদ্ধি, কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে পরিবার-বিদ্যালয়-পুলিশের যৌথ কার্যক্রম।

সীমান্ত ও নৌ–রুট নজরদারিতে প্রযুক্তির ব্যবহার
নতুন পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে শরীয়তপুর সত্যিকার অর্থেই মাদকমুক্ত জেলার মডেল হতে পারে।

আইনশৃঙ্খলা—উন্নয়নের প্রথম শর্ত: একটি জেলার উন্নয়নের মূলে থাকে শান্তি, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার।
শরীয়তপুরে সড়ক দুর্ঘটনা, চুরি–ডাকাতি, নারী ও শিশু নির্যাতন, জমি-সম্পত্তি বিরোধ, এবং নির্বাচনী সহিংসতার মতো দীর্ঘদিনের সমস্যা আছে।
নবাগত পুলিশ সুপারের সামনে তাই এসব চ্যালেঞ্জকে আজ নতুন কৌশলে মোকাবিলা করার সুযোগ রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা আধুনিক করতে কয়েকটি দিক অপরিহার্য কমিউনিটি পুলিশিংকে আরও শক্তিশালী করা। পুলিশ ও জনগণের মধ্যে বিশ্বাস না থাকলে অপরাধ দমন অসম্ভব।
একজন সৎ পুলিশ সুপারের সামনে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জনগণের সহযোগিতা। সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে বিশেষ ইউনিট বৃদ্ধি

আজকের অপরাধীরা ফেসবুক–মেসেঞ্জার–টেলিগ্রাম–হোয়াটসঅ্যাপে সক্রিয়।
এই ক্ষেত্রটি উপেক্ষা করলে বড় ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ অসম্ভব হয়ে পড়বে।

নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় ‘জিরো টলারেন্স’ বিশেষত গ্রামের পরিবেশে অনেক ভুক্তভোগী ন্যায়বিচারের মুখও দেখতে পারেন না।
এখানে পুলিশের ভূমিকা বড়।

ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল পদ্ধতি, সড়ক দুর্ঘটনা শুধু শৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি মানবিক বিপর্যয়।
যদি প্রযুক্তিভিত্তিক মনিটরিং জোরদার হয়—হেলমেট সচেতনতা, লাইসেন্স যাচাই, স্টিকার জালিয়াতি প্রতিরোধ তাহলে সড়ক নিরাপত্তা দ্রুত উন্নত হবে।

কোন এলাকায় কোন অপরাধ বেশি এর ভিত্তিতে টহল ও টাস্কফোর্স গঠন করলে জেলা দ্রুত নিরাপদ হবে।

নতুন পুলিশ সুপার যদি এসব উদ্যোগে নিজস্ব উদ্ভাবনী ক্ষমতা যোগ করেন, শরীয়তপুরে আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন হবে চোখে পড়ার মতো।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা—পুলিশ–সাংবাদিক সম্পর্কের মূল শক্তি আইনশৃঙ্খলা উন্নত করতে গেলে সবচেয়ে বড় সহযোগী হলো—সাংবাদিক সমাজ।
কারণ—সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে প্রথম পৌঁছান।

তারা সমাজের অন্ধকার দিকগুলো আলোকিত করেন।
প্রশাসনের ভুল বা প্রয়োজনীয় দিকগুলো সামনে আনেন।

জনগণের অভিযোগ জানানোর সেতুবন্ধন তৈরি করেন।

সুতরাং একজন পুলিশ সুপারের প্রথম দায়িত্বগুলোর একটি হলো সাংবাদিকদের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলা।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় নবাগত এসপি রওনক জাহান সাংবাদিকদের সম্মান দিয়েছেন, তাদের মতামত শুনেছেন, তাদের সমস্যার কথা মনোযোগ দিয়ে গ্রহণ করেছেন—এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বার্তা।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পুলিশের ভূমিকা— সংবাদ সংগ্রহে বাধা না দেওয়া। তথ্যের স্বচ্ছতা বজায় রাখা। সাংবাদিক নিরাপত্তা সেল সক্রিয় করা

ভুয়া মামলার ভয় দূর করা । অভিযোগ তদন্তে সাংবাদিকদের বক্তব্যকেও গুরুত্ব দেওয়া পুলিশ–সাংবাদিক মিলেই একটি সত্যভিত্তিক সমাজ গড়ে—যেখানে অপরাধীরা ভয় পায়, সাধারণ মানুষ নিরাপদ থাকে।

নতুন পুলিশ সুপারের প্রতি উৎসাহ ও প্রত্যাশা।
নবাগত পুলিশ সুপার রওনক জাহানের ভাষণে স্পষ্ট একটি অঙ্গীকার ছিল “শরীয়তপুরের মানুষকে নিরাপদ রাখতে আমরা যেকোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।”

এই ঘোষণার মধ্যেই তার নেতৃত্বের দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়।
তার দৃঢ় মনোভাব, কর্মদক্ষতা ও অভিজ্ঞতা শরীয়তপুরকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

আমাদের প্রত্যাশা তিনি ভয়ভীতি–চাপমুক্ত থেকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন।

মাদক নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করবেন।

সাংবাদিকদের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি স্বচ্ছ জেলা পুলিশ গঠন করবেন।

সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করে পুলিশকে বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে রূপ দেবেন।

শরীয়তপুরের মানুষ বিশ্বাস করে একজন সৎ, দৃঢ় ও মানবিক পুলিশ সুপার একটি জেলার ভাগ্য বদলে দিতে পারেন।

মাদক, আইনশৃঙ্খলা ও গণমাধ্যম এই তিনটি স্তম্ভই একটি নিরাপদ, উন্নত ও মানবিক সমাজ গড়ার ভিত্তি।
নতুন পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে যদি এই তিনটি ক্ষেত্র সমন্বিতভাবে এগিয়ে যায়, তাহলে শরীয়তপুর হবে একটি শান্ত শৃঙ্খলাপূর্ণ জেলার অনুকরণীয় মডেল।

আমরা বিশ্বাস করি, তার নেতৃত্বে, মাদকমুক্ত সমাজের স্বপ্ন বাস্তব হবে, আইনশৃঙ্খলা হবে আরও শক্তিশালী,
গণমাধ্যম পাবে স্বাধীনতার নতুন পরিসর।

নতুন পুলিশ সুপারের জন্য আমাদের শুভকামনা ও আন্তরিক উৎসাহ।

লেখক: শহীদুল ইসলাম পাইলট, সম্পাদক ও কলাম লেখক।

Facebook Comments Box