নড়াইল সদর উপজেলার দক্ষিণাঞ্চলের বিলাঞ্চল এখন নারীদের এক ব্যতিক্রমী জীবিকার কেন্দ্রস্থল। তালগাছের ডোঙ্গায় ভর করে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিলের পানিতে কাটছে তাদের দিন। শাপলা, কলমি শাক সংগ্রহ আর মাছ ধরেই চলছে তাদের সংসার। বর্ষা যেন লাঞ্চ বিল অঞ্চলের মহিলাদের কাছে আশীর্বাদ হয়ে এসেছে !
গুয়াখোলা গ্রামের পঞ্চাশোর্ধ্ব সবিতা অধিকারী দিনের শুরুটা করেন নিজের হাতে তৈরি ডোঙ্গা নিয়ে দেবভোগ বিলে ছুটে গিয়ে। কয়েক ঘণ্টা ধরে শাপলা সংগ্রহ করে বাড়ি ফেরেন। এরপর রান্না, গবাদি পশুর যত্ন, আবারো বিকেলের দিকে ডোঙ্গা নিয়ে ছুটে যান পশুর খাদ্যের খোঁজে। দিনভর তার জীবনের সঙ্গী যেন হয়ে উঠেছে এই বিল আর তাল গাছের তৈরি ছোট্ট ডোঙ্গাটি।
শুধু সবিতা অধিকারী নন, মালিয়াট, শিমুলিয়া, মুলিয়াত, হাতিয়াড়া গ্রামের অনেক নারীই বিলের এমন জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। সকালে শাপলা ও কলমিশাক সংগ্রহ, বড়শি দিয়ে মাছ ধরা- সবকিছুই এখন তাদের নিয়মিত কাজ। যারা বেশি মাছ ধরতে পারেন, তারা বাজারে বিক্রি করেন, বাকিরা নিজেদের পরিবারের প্রয়োজন মেটান।
ষাটোর্ধ্ব নারী কল্পনা বিশ্বাস বলেন, ৪০ বছর ধরে এই কাজ করি। আগে স্বামীর সঙ্গে করতাম, এখন একাই করি। শাপলা তুলেই সংসার চলে। জমি নাই, ঘর নাই, সরকারি সাহায্য পায় জমি-ওয়ালারা, আমরাই বঞ্চিত।
তিনি আরও জানান, সপ্তাহে দু’দিন তুলারামপুর হাট, দু’দিন রূপগঞ্জ হাটে শাপলা বিক্রি করেন, কখনো আবার ব্যাপারীরা বাড়ি থেকেই কিনে নেন।
এসব নারীরা গড়ে প্রতিদিন ৮০ থেকে ১০০ আঁটি শাপলা সংগ্রহ করেন। প্রতিটি আঁটিতে ২০টির মতো শাপলা থাকে, যার দাম পড়ে ৫ টাকা। এতে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার মতো আয় হয়। বিলের পানির ওপর নির্ভর করে কখনো সারা বছর, কখনো মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চলে এই সংগ্রামের জীবন।
বিলপাড়ের এই জীবিকার অন্যতম বাহন তালগাছের তৈরি ছোট নৌকা, স্থানীয়ভাবে যাকে ডোঙ্গা বলা হয়। সাধারণত পুরুষরা এই বাহন ব্যবহার করলেও এখানে নারীরাও সমান দক্ষতায় ডোঙ্গা চালিয়ে তাদের জীবন ও জীবিকার পথ তৈরি করছেন।
যশোর থেকে শাপলা কিনতে আসা ব্যাপারী অমর মন্ডল বলেন, গুয়াখোলা আর হাতিয়াড়া থেকে সপ্তাহে তিনদিন শাপলা কিনি। মনিরামপুরে বিক্রি করি। দশ বছর ধরে এই ব্যবসা করি, আমারও সংসার চলে এই শাপলা দিয়েই।
নড়াইল সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রোকনুজ্জামান বলেন, বিলে প্রাকৃতিকভাবে প্রচুর শাপলা জন্মে। এটা এখন খুবই পুষ্টিকর এবং জনপ্রিয় খাবার। এই কাজে নানা বয়সের মানুষ যুক্ত হচ্ছে, বিশেষ করে নারীরা এখান থেকে আয় করে স্বনির্ভর হচ্ছেন।

মন্তব্য করুন