বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির সান্নিধ্যে থেকে বাস্তবধর্মী ও হাতে-কলমে শিক্ষাই হলো কারিগরি শিক্ষা। যে শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে তথ্যপ্রযুক্তি, শিল্প, কৃষি ও কলকারখানার যন্ত্রপাতি ব্যবহারের জন্য আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। অর্থাৎ, আমাদের শ্রমবাজারকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে দক্ষ শ্রমিকে রূপান্তর এবং দেশের শিল্পায়নের পথে কারিগরি শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বর্তমান চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে আমাদের দেশে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব এতটাই বেশি যে, এর মাধ্যমে শতভাগ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি সম্ভব। আমাদের প্রয়োজন দক্ষ কারিগর ও দক্ষ অপারেটর। সবাইকে বিএ, এমএ পাস করার প্রয়োজন নেই। কারণ, এসব সার্টিফিকেটধারীকে চাকরি দেওয়ার সুযোগ আমাদের দেশে সীমিত। বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত না হলে বিদেশেও চাকরির সুযোগ নেই বললেই চলে।
বর্তমান বিশ্বে চাকরির বাজারে উৎপাদনশীল খাতই সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে থাকে। বর্তমানে উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে শিল্পায়নের ফলে নতুন নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠছে। সেখানে বিনিয়োগ করছে পৃথিবীর বড় বড় পণ্য ও সেবা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। এসব কারণেই আমাদের দেশে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় উন্নত দেশগুলো কারিগরি শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে উৎপাদনমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেশের উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আধুনিক যন্ত্রপাতি ও উপকরণ ব্যবহার এবং কৌশল প্রয়োগ করে শিল্প ও কৃষিতে বিপ্লব ঘটিয়েছে।
কারিগরি শিক্ষা একটি উৎপাদনভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা, যা দেশের জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। কারিগরি শিক্ষা শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে। এতে শ্রমিক সহজেই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে পারে। এর মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের সুযোগ বৃদ্ধি পায়।
কারিগরি শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পায়। প্রয়োজনীয় মূলধন অর্জন করে জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন করা সম্ভব হয়। কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে চীন তার বিশাল জনগোষ্ঠীকে ‘Human Capital’ বা মানবসম্পদে রূপান্তর করে শিল্পায়নে ইউরোপের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে।
তাই দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, আত্মকর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।
কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে জাতীয় শিক্ষা কমিশন বলেছে, ‘Education should be developed as to increase productivity.’ আমরা কারিগরি শিক্ষার নিম্নোক্ত প্রয়োজনীয়তাগুলো অনুধাবন করতে পারি—
উৎপাদনশীলতা
বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা শিক্ষার্থীদের উৎপাদনমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত করে সমাজ ও দেশের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে।
স্বনির্ভরতা
বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিটি শিক্ষার্থীকে স্বনির্ভর হতে সহায়তা করে। এই শিক্ষার ফলে শিক্ষার্থী হয় কোনো চাকরির সুযোগ পায়, নয়তো স্বনির্ভর কাজে যুক্ত হতে পারে।
জাতীয় আয় বৃদ্ধি
বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা যেহেতু উৎপাদনভিত্তিক শিক্ষা, তাই এটি জাতীয় আয় বৃদ্ধি ও দেশের উন্নয়নে সহায়তা করে।
শ্রমের প্রতি মর্যাদা
এই শিক্ষার শিক্ষার্থীরা কায়িক শ্রমের মাধ্যমে উপার্জন করে থাকে। ফলে এর মাধ্যমে তাদের মধ্যে শ্রমের প্রতি মর্যাদাবোধ সৃষ্টি হয়।
জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ
বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভের সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য এ ধরনের বৃত্তিমূলক শিক্ষা খুবই প্রয়োজন। এর ফলে তারা উৎপাদনমূলক কাজে নিজেদের নিয়োজিত করতে পারে এবং অর্থ উপার্জনে সক্ষম হয়।
কর্মমুখী শিক্ষার প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি
পুঁথিগত ও একঘেয়েমিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা থেকে নিজেকে দূরে রেখে ব্যবহারিক ও হাতে-কলমে শিক্ষায় উৎসাহ বৃদ্ধি পায়। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কর্মমুখী শিক্ষার প্রতি এক ধরনের ইতিবাচক মনোভাব গড়ে ওঠে।
কর্মসংস্থানের সুযোগ
বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা শিক্ষার্থীদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি করে। এর মাধ্যমে চাকরি বা আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
কারিগরি শিক্ষায় প্রয়োজনীয় ও পরিকল্পিত বিনিয়োগের মাধ্যমে আমাদের দেশের জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে রূপান্তরের মধ্যেই কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা নিহিত। প্রশিক্ষিত মানবসম্পদের যোগান দেওয়াই হলো কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষার মূল লক্ষ্য।
সর্বোপরি, কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার মাধ্যমেই আমাদের দেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব। কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগের ‘Rate of Return’ বা বিনিয়োগের সুফলও তুলনামূলকভাবে বেশি।
লেখক:
শফিকুল ইসলাম সোহেল
ট্রেড ইন্সট্রাক্টর
কনেশ্বর এস. সি. এডওয়ার্ড ইনস্টিটিউশন
ডামুড্যা, শরীয়তপুর।

মন্তব্য করুন