দিনভর কাগজপত্রে ত্রুটি ও তথ্যের অসংগতির অজুহাতে দলিল ফেরত দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে রংপুরের পীরগাছা সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সকাল থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও দলিল নিবন্ধন করাতে পারছেন না তাঁরা। অথচ সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে দিনের বেলায় ফেরত দেওয়া কিছু দলিল নিবন্ধন করে দেওয়া হচ্ছে।

এ ধরনের অভিযোগ পীরগাছা সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে দীর্ঘদিনের। এর আগে সাব-রেজিস্ট্রার বার্নার্ড মার্ডী দায়িত্বে থাকাকালেও দিনের বেলায় বিভিন্ন ত্রুটি দেখিয়ে দলিলে আপত্তি তোলা এবং পরে বাড়তি অর্থের বিনিময়ে রাত পর্যন্ত কার্যালয় খোলা রেখে নিবন্ধন করার অভিযোগে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।

সম্প্রতি বার্নার্ড মার্ডী পীরগাছার দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়ার পর সাব-রেজিস্ট্রার রিপন চন্দ্র মণ্ডলকে সেখানে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই একই ধরনের অভিযোগ ওঠায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, কর্মকর্তা পরিবর্তন হলেও কার্যালয়ের কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ কেন থামছে না।

অভিযোগ অনুযায়ী, বুধবার দুপুর থেকে পীরগাছা সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে প্রায় ৫০টি দলিল ফেরত দেওয়া হয়। এসব দলিলে বিভিন্ন ধরনের ত্রুটি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়। ফলে নির্ধারিত কর্মঘণ্টার মধ্যে সেগুলো নিবন্ধন করা হয়নি।

ভুক্তভোগীদের দাবি, দিনভর অপেক্ষার পর সন্ধ্যার দিকে বাড়তি অর্থের বিনিময়ে ফেরত দেওয়া দলিলগুলোর কয়েকটি আবার গ্রহণ করা হয়। এরপর রাত পর্যন্ত কার্যালয়ের কার্যক্রম চালিয়ে সেগুলো নিবন্ধন করে দেওয়া হয়।

দলিল সম্পাদন করতে আসা অনন্তরাম উচাপাড়া গ্রামের স্বপন বসাক অভিযোগ করে বলেন, পীরগাছা সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে দুর্নীতি চলছে। তিনি সকাল ১০টা থেকে সেখানে অপেক্ষা করলেও সারাদিন বিভিন্ন অজুহাতে তাঁর দলিল ফেরত দেওয়া হয়। অথচ সন্ধ্যার পর সাব-রেজিস্ট্রার দলিলে স্বাক্ষর করেন। তাঁর অভিযোগ, অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার পরই দলিল সম্পাদন করা হচ্ছে।

তালুক ইশাদ দুধিয়াবাড়ি গ্রামের মিঠু মাস্টারও একই অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, সকাল থেকে অপেক্ষা করেও দিনের বেলায় দলিল সম্পাদন করাতে পারেননি। বিভিন্ন অজুহাতে দলিল ফেরত দেওয়ার পর সন্ধ্যায় টাকা নিয়ে সেগুলো সম্পাদন করা হচ্ছে।

এ ঘটনায় ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, দিনের বেলায় যে ত্রুটির কারণে দলিল নিবন্ধন করা সম্ভব হয়নি, সন্ধ্যার পর সেই ত্রুটি কীভাবে দূর হলো? দলিলগুলো নিবন্ধনের উপযোগী হয়ে থাকলে দিনের বেলায় সেগুলো ফেরত দেওয়ার কারণই বা কী?

স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, নির্ধারিত সময়ে নিয়ম মেনে দলিল নিবন্ধন করতে গেলে নানা অজুহাতে তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু অতিরিক্ত অর্থ দিতে রাজি হলে একই দলিল দ্রুত সম্পন্ন করা হয়। এতে সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন এবং বাড়তি টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছেন বলে তাঁদের দাবি।

এক ভুক্তভোগী কৃষক জানান, দুই শতক জমির একটি দলিল নিবন্ধন করাতে তিনি সারাদিন কার্যালয়ে ঘোরাঘুরি করেন। বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে তাঁর কাজ সম্পন্ন করা হয়নি। পরে টাকা দেওয়ার পর তাঁকে ডেকে এনে দলিলটি নিবন্ধন করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

নির্ধারিত সময়ের পরও কার্যালয়ের কার্যক্রম চলার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২০২৬ সালের ৪ এপ্রিলের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ৫ এপ্রিল থেকে সরকারি ও বেসরকারি অফিসের সময় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা নির্ধারণ করা হয়। এ অবস্থায় নির্ধারিত সময়ের পর পীরগাছা সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে দলিল নিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন ও বৈধতা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।

নিবন্ধন আইনের বিধান অনুযায়ী, কোনো দলিল নিবন্ধনে অস্বীকৃতি জানালে সাব-রেজিস্ট্রারকে তার কারণ লিখিতভাবে লিপিবদ্ধ করতে হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি চাইলে ওই কারণের অনুলিপিও নিতে পারেন। এ কারণে বুধবার ফেরত দেওয়া প্রায় ৫০টি দলিলের ক্ষেত্রে কী কী লিখিত কারণ দেখানো হয়েছিল এবং পরে কী প্রক্রিয়ায় সেগুলোর কিছু নিবন্ধন করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

সাব-রেজিস্ট্রার রিপন চন্দ্র মণ্ডলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পাশাপাশি তাঁর আগের কর্মস্থল নিয়েও আলোচনা রয়েছে। এর আগে রংপুরের গঙ্গাচড়া সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। তবে সে সময় তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে আইন মেনেই কাজ করার দাবি করেছিলেন।

অন্যদিকে, বার্নার্ড মার্ডী পীরগাছায় দায়িত্ব পালনকালেও দলিল নিবন্ধনে অনিয়মের অভিযোগ সংবাদে উঠে আসে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনেও তাঁর বিরুদ্ধে কমিশনে দলিল নিবন্ধনের নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রকাশিত হয়। তবে বার্নার্ড মার্ডী ওই অভিযোগের বিষয়ে নিয়ম মেনেই দলিল সম্পাদনের দাবি করেছিলেন।

সাব-রেজিস্ট্রার পরিবর্তনের পরও একই ধরনের অভিযোগ ওঠায় কার্যালয়টির কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ভুক্তভোগীরা বুধবার ফেরত দেওয়া দলিলের তালিকা, ফেরতের লিখিত কারণ, পরে নিবন্ধিত দলিলের তালিকা, নিবন্ধনের সময় এবং সরকারি ফি আদায়ের হিসাব যাচাই করে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন।

তাঁদের বক্তব্য, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত বিষয়টি স্পষ্ট করা।

এ বিষয়ে সাব-রেজিস্ট্রার রিপন চন্দ্র মণ্ডলের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পীরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জায়িদ ইমরুল মোজাক্কিন বলেন, সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয় তাঁর অধীনস্থ দপ্তর নয়। তবে নাগরিকদের হয়রানির বিষয়ে অভিযোগ পেলে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবেন।