পদ্মা সেতু ও সংযোগ সড়কে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার উদ্দেশ্যে শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নির্মাণ করা হয়েছিল ১৫ শয্যার ট্রমা সেন্টার। তবে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার এক যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে চালু হয়নি এর স্বতন্ত্র কার্যক্রম।

জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসার জন্য নির্মিত ট্রমা সেন্টারের কয়েকটি কক্ষ বর্তমানে অন্য কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিছু কক্ষ আবার দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ। ফলে পদ্মা সেতু ও আশপাশের মহাসড়কে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকাসহ দূরের হাসপাতালে নিতে হচ্ছে। এতে সময় ও ভোগান্তি দুটোই বাড়ছে।

সড়ক দুর্ঘটনায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, হাড় ভাঙা, মাথায় আঘাত কিংবা শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হলে দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিকিৎসা এবং প্রয়োজন হলে অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা জরুরি। কিন্তু জাজিরায় ট্রমা সেন্টারটি কার্যকর না থাকায় এসব জরুরি সেবা স্থানীয় পর্যায়ে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। আহত ব্যক্তিকে অন্য হাসপাতালে নেওয়ার সময় তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতির আশঙ্কাও থাকে।

জানা গেছে, পদ্মা সেতুর গুরুত্ব এবং সংযোগ সড়কসহ আশপাশের মহাসড়কে দুর্ঘটনায় হতাহতদের জরুরি চিকিৎসার বিষয়টি বিবেচনায় ২০১৩-১৪ অর্থবছরে জাজিরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ট্রমা সেন্টার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সঙ্গে ১৫ শয্যার ট্রমা ইউনিট যুক্ত করে চারতলা ভবন নির্মাণ করা হয়। ভবনের নিচতলার পুরো অংশ ট্রমা সেন্টারের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, জরুরি অবস্থায় রোগীর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল করতে রিসাসিটেশন কক্ষ, এক্সরে কক্ষ, রোগী পর্যবেক্ষণের জন্য অবজারভেশন কক্ষ, অস্ত্রোপচারের জন্য অপারেশন থিয়েটার এবং শয্যাকক্ষ রাখা হয়। দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত হাসপাতালে এনে প্রাথমিক জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থাও রাখার পরিকল্পনা ছিল।

তবে অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হলেও চিকিৎসাসেবা চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে দীর্ঘ সময়েও ট্রমা সেন্টারটি কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে পরিণত হয়নি। এক যুগের বেশি সময় ধরে স্থানীয় বাসিন্দারা কেন্দ্রটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর অপেক্ষায় রয়েছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ট্রমা সেন্টারের জন্য নির্ধারিত নিচতলার কক্ষগুলো বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অন্যান্য কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেখানে চলছে জরুরি বিভাগ ও ডেন্টাল ইউনিটের কার্যক্রম। গুরুতর আহতদের জরুরি পুনরুজ্জীবন ও জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত রিসাসিটেশন কক্ষটি এখন স্টোররুম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেখানে একটি মোটরসাইকেলও রাখা হয়েছে।

রোগীদের পর্যবেক্ষণের জন্য নির্ধারিত অবজারভেশন কক্ষে চলছে পরিবার পরিকল্পনা ক্লিনিকের কার্যক্রম। আর দুর্ঘটনায় আহতদের অস্ত্রোপচারের জন্য নির্মিত অপারেশন থিয়েটারটি দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অর্থাৎ, আলাদা কক্ষ ও অবকাঠামো থাকলেও ট্রমা সেন্টারটি পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পদ্মা সেতু ও সংযোগ সড়ক ঘিরে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহতদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে জাজিরায় কার্যকর ট্রমা সেন্টার থাকা জরুরি। কারও হাত-পা ভেঙে যাওয়া বা গুরুতর জখমের ক্ষেত্রে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিতে হয়। অ্যাম্বুলেন্স বা অন্য যানবাহনে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার কারণে গুরুতর রোগীর চিকিৎসায় বিলম্ব হতে পারে, যা তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তাদের মতে, ট্রমা সেন্টারটি চালু থাকলে অন্তত প্রাথমিক জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা, জরুরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং রোগীর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল করার ব্যবস্থা স্থানীয় পর্যায়েই করা সম্ভব হতো। প্রয়োজনে পরে উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানোর আগ পর্যন্ত রোগীর অবস্থা সামাল দেওয়ার সুযোগও তৈরি হতো।

ভবিষ্যতে শরীয়তপুরের মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত হলে যানবাহনের চাপ ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। এ পরিস্থিতিতে সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করতে জাজিরার ট্রমা সেন্টার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট দূর করে দ্রুত কেন্দ্রটি চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা।

জাজিরা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রোমান বাদশাহ বলেন, পদ্মা সেতুর গুরুত্ব বিবেচনায় ২০১৩ ও ২০১৪ অর্থবছরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ট্রমা সেন্টার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম বরাদ্দ না থাকায় এর কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, পদ্মা সেতুর প্রবেশমুখে ট্রমা সেন্টারটি চালু থাকলে সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের তাৎক্ষণিক জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হতো। এ কারণে কেন্দ্রটি কার্যকর করা গুরুত্বপূর্ণ।

শরীয়তপুরের সিভিল সার্জন ডা. রেহান উদ্দিন বলেন, তীব্র জনবলসংকটের কারণেই মূলত ট্রমা সেন্টারটি চালু করা যাচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে প্রতি মাসেই লিখিতভাবে জানানো হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কেন্দ্রটি চালুর বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।