জ্যেষ্ঠতার তালিকা চূড়ান্ত করা নিয়ে চলমান একাধিক মামলার কারণে গণপূর্ত অধিদপ্তরের শতাধিক প্রকৌশলীর পদোন্নতি আটকে রয়েছে। সরাসরি নিয়োগ ও পদোন্নতির মাধ্যমে সহকারী প্রকৌশলী হওয়া কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ নিয়ে বিরোধ আদালতে গড়ানোর পর থেকেই পদোন্নতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া থমকে আছে।

পদোন্নতি না হওয়ায় গণপূর্ত অধিদপ্তরে সিভিল শাখায় উপবিভাগীয় প্রকৌশলীর ৪১টি পদ এবং তড়িৎ ও যান্ত্রিক শাখায় ৩১টি পদ শূন্য রয়েছে। এসব পদে পদোন্নতির জন্য যোগ্য কর্মকর্তার সংখ্যা শতাধিক বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, জ্যেষ্ঠতার তালিকা চূড়ান্ত না করে পদোন্নতি দিলে নতুন করে আইনি জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই আদালতে চলমান মামলার নিষ্পত্তির পরই পদোন্নতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবস্থান নিয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়।

গণপূর্তের প্রকৌশলীদের পদোন্নতি ও মামলাসংক্রান্ত বিষয় দেখভালকারী মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সারোয়ার আলম বলেন, একই পঞ্জিকাবর্ষের শুরুতে যারা আগে যোগদান করেন, ১৯৭০ সালের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের সাধারণ নীতিমালার একটি ধারার ভিত্তিতে তাদের আগে রাখার নিয়ম ছিল। তবে বিভিন্ন কারণে জ্যেষ্ঠতার তালিকা তৈরি ও পদোন্নতি আটকে যায়।

তিনি জানান, প্রায় পাঁচ বছর পদোন্নতি আটকে থাকার পর ২০২৫ সালে দুই পক্ষ আদালতে রিট করে। নন-ক্যাডারদের জ্যেষ্ঠতার তালিকা তৈরির বিষয়ে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ থাকায় প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না। এর সঙ্গে আরও কয়েকটি বিষয় যুক্ত থাকায় তালিকা চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি।

সারোয়ার আলম বলেন, জ্যেষ্ঠতার তালিকা চূড়ান্ত না হওয়ায় প্রায় ৮০টি পদ শূন্য রয়েছে। এসব পদে দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ না থাকায় প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কার্যক্রমে প্রভাব পড়ছে। অনেক কর্মকর্তাকে একই সঙ্গে নিজের দায়িত্বের বাইরে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।

তিনি জানান, বর্তমানে সহকারী প্রকৌশলী পদে সরাসরি নিয়োগ এবং পদোন্নতির মাধ্যমে দায়িত্ব পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে শতাধিক কর্মকর্তা পরবর্তী পদে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করেছেন। তবে এক পক্ষকে পদোন্নতি দেওয়া হলে অন্য পক্ষ আবার আদালতের আশ্রয় নিতে পারে। এ কারণে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর সেই অনুযায়ী পদোন্নতি দেওয়ার বিষয়ে মন্ত্রণালয় এগোতে চায়।

পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে ৩৭তম থেকে ৪৪তম বিসিএসের গণপূর্ত ক্যাডারের প্রকৌশলীরাও রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, জ্যেষ্ঠতার তালিকা চূড়ান্ত না হওয়ায় ৩৭তম বিসিএসের কর্মকর্তারা নবম গ্রেড থেকে ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি পাচ্ছেন না। ৩৮তম বিসিএসের কর্মকর্তারাও দীর্ঘ সময় ধরে একই পদে রয়েছেন এবং তারাও ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতির অপেক্ষায় আছেন। একই কারণে নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের একটি অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২০ মার্চ ৩৭তম বিসিএসের মাধ্যমে ৪৪ জন সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ পান। একই বছরের ৩০ ডিসেম্বর ২৫ জন উপসহকারী প্রকৌশলী পদোন্নতি পেয়ে সহকারী প্রকৌশলী হন।

এরপর ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি ৩৮তম বিসিএসের মাধ্যমে ৬১ জন সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) এবং ৩২ জন সহকারী প্রকৌশলী (তড়িৎ ও যান্ত্রিক) নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই বছরের ২ নভেম্বর ৩০ জন উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) এবং ২৩ জন উপসহকারী প্রকৌশলী (তড়িৎ ও যান্ত্রিক) পদোন্নতির মাধ্যমে সহকারী প্রকৌশলী হন।

একই পঞ্জিকাবর্ষে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা এবং পদোন্নতির মাধ্যমে সহকারী প্রকৌশলী হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের প্রশ্ন থেকেই বিরোধের সূত্রপাত।

এক পর্যায়ে বিসিএসের মাধ্যমে সরাসরি সহকারী প্রকৌশলী হওয়া একদল কর্মকর্তা আগের প্রচলিত পদ্ধতির পরিবর্তে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সময় থেকে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আদালতে রিট করেন।

হাইকোর্ট বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়। তদন্ত শেষে কমিটি আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে অনুমোদিত জ্যেষ্ঠতার তালিকা ছাড়াই বিধিমালা অনুসরণ না করে কিছু প্রকৌশলীকে পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।

পরবর্তীতে হাইকোর্ট ওই প্রক্রিয়ায় দেওয়া সুবিধা ও জ্যেষ্ঠতা অবৈধ ঘোষণা করে। ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মতামত দেয়। মন্ত্রণালয়ের মত অনুযায়ী, ১৯৮৩ সালের বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস জ্যেষ্ঠতা বিধিমালার ৩(ঙ) বিধানের আলোকে ক্যাডার পদে যোগদানের তারিখ থেকে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা যেতে পারে।

পরে আপিল বিভাগ সরাসরি ক্যাডার পদে নিয়োগ পাওয়া প্রকৌশলীদের চাকরিতে যোগদানের তারিখের আগে থেকে জ্যেষ্ঠতা দাবি করার সুযোগ নেই বলে সিদ্ধান্ত দেয়। একই সঙ্গে বিষয়টি দুই মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টকে নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে রিটকারী ক্যাডার কর্মকর্তারা রিভিউ আবেদন করেন। বর্তমানে বিষয়টি ওই পর্যায়ে রয়েছে।

অন্যদিকে নন-ক্যাডার বা ডিপ্লোমাধারী পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের একটি অংশ পৃথক রিট করেন। তাদের আবেদনে ক্যাডার সার্ভিসের মাধ্যমে সরাসরি সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। সরকার ওই রিটের বিরুদ্ধে দেওয়ানি আবেদন করে। পরে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের করা রিটের ওপর আদালত স্থগিতাদেশ দেয়।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক সহকারী প্রকৌশলী বলেন, নিয়মিত ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা, বিভাগীয় পরীক্ষা, সংশ্লিষ্ট বিধি ও অন্যান্য যোগ্যতা বিবেচনা করা হয়। একই ক্যাডারের উচ্চতর পদে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নেওয়া হলে ভবিষ্যতে জ্যেষ্ঠতা ও ক্যাডার কাঠামো নিয়ে আরও জটিলতা তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে পদোন্নতির মাধ্যমে সহকারী প্রকৌশলী হওয়া এক কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে যে প্রক্রিয়ায় পদোন্নতি হয়ে আসছে, সেটি পরিবর্তন করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন করে জটিলতা তৈরি হবে।

আদালতে চলমান মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জ্যেষ্ঠতার তালিকা ও পদোন্নতির বিষয়টি ঝুলে থাকায় একদিকে যেমন বহু কর্মকর্তা দীর্ঘদিন একই পদে আটকে আছেন, অন্যদিকে তেমনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদও শূন্য রয়েছে।