সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের যাদুকাটা নদী থেকে বালু-পাথর উত্তোলনকে ঘিরে বিএনপি ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের একটি অংশের যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের বিশেষ শাখার একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসন, পুলিশ ও স্থানীয় একটি অংশের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেট ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও নদী থেকে বালু-পাথর উত্তোলন চালিয়ে যাচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বালু উত্তোলনে পরিবেশবান্ধব সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে ড্রেজার, শ্যালো ও অন্যান্য যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তনের পাশাপাশি তীর, সড়ক, বসতবাড়ি, সরকারি খাসজমি ও হাওর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে যাদুকাটা নদীর জীববৈচিত্র্য এবং নদীনির্ভর শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকাও হুমকির মুখে পড়েছে।

পুলিশের বিশেষ শাখার ‘অতি গোপনীয়’ হিসেবে চিহ্নিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুনামগঞ্জের তিন সংসদ সদস্য এবং আওয়ামী লীগসংশ্লিষ্ট কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে যাদুকাটা, ধোপাজান ও চেলা নদীর বালু-পাথর উত্তোলন নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে বালু ব্যবসা, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা বালু ও পাথরের কারণে যাদুকাটা নদীটি প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। নদীটির অববাহিকায় রয়েছে রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওর। স্বচ্ছ সবুজাভ পানির কারণে নদীটি পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয়। প্রতিবছর এ নদী থেকে বিপুল পরিমাণ বালু, নুড়ি, বোল্ডার ও ভাঙা পাথর উত্তোলন করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। এতে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক যুক্ত, যাদের মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার বারকি শ্রমিক।

বিশেষ শাখার প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ড্রেজার ও শক্তিশালী যন্ত্র ব্যবহার করে নদীর তলদেশ থেকে বালু তোলার কারণে বারকি শ্রমিকদের প্রচলিত জীবিকা সংকুচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে নদীর তলদেশ ও তীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ায় পরিবেশগত ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যাদুকাটা নদীর বালুমহাল মাত্র দুই থেকে তিন কোটি টাকায় ইজারা দেওয়া হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলা ১৪৩২ সনের জন্য যাদুকাটা-১ ও যাদুকাটা-২ বালুমহাল ১০৭ কোটি ২৫ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়। এর মধ্যে যাদুকাটা-১-এর ইজারামূল্য ছিল ৩৭ কোটি ৫০ লাখ এবং যাদুকাটা-২-এর ৬৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।

ইজারার মেয়াদ বাংলা ১৪৩২ সালের ১ বৈশাখ থেকে ৩০ চৈত্র পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল। গত মার্চে মেয়াদ শেষ হলেও বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ইজারার মেয়াদ আরও সাত মাস বাড়ানোর আবেদন জানিয়ে ইজারাদার নাছির মিয়া ও শাহ রুবেল আহমেদ হাইকোর্টে রিট করেন। এরপর আদালতের কার্যক্রমকে সামনে রেখে বালু উত্তোলন অব্যাহত রাখার অভিযোগ ওঠে। পুলিশের বিশেষ শাখার প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এভাবে সরকার ৩০০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

প্রতিবেদনে সুনামগঞ্জ-১ আসনের কামরুজ্জামান কামরুল, সুনামগঞ্জ-৪ আসনের নুরুল ইসলাম নুরুল এবং সুনামগঞ্জ-৫ আসনের কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলনের নাম উল্লেখ করে বালু-পাথর উত্তোলন নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ স্থলবন্দর শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আজাদ হোসেনের বিরুদ্ধেও ওই ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি তাহিরপুরের বালিজুরি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক খন্দকার মঞ্জুর হোসেন বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে কামরুজ্জামান কামরুলকে একটি ল্যান্ড ক্রুজার গাড়ি উপহার দিয়েছিলেন। এ ছাড়া একাধিক মামলার আসামি মানিক মেম্বারের মাধ্যমে ধোপাজান নদীতে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ করা হয়েছে। সেখানে প্রতি ঘনফুট বালুর জন্য পাঁচ টাকা এবং প্রতিটি নৌকা থেকে দুই হাজার টাকা করে আদায়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইব্রাহিমপুরে রাজস্বের নামে প্রতি ঘনফুট বালু থেকে আরও ১০ টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

চেলা নদীতেও ড্রেজার, বোমা ও শ্যালো মেশিন ব্যবহার করে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিনান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শাহ রুবেল আহমেদ সেখানে বালু উত্তোলন করছেন। একই প্রতিবেদনে শিবার সরোয়ার শিপুর বিরুদ্ধে যাদুকাটা নদীতে একাধিক ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগ আনা হয়েছে। গত জুলাইয়ে ঢাকার গোয়েন্দা পুলিশ শিপু ও জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি তোফায়েল আহমেদ রয়েলকে গ্রেপ্তার করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষ শাখার প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, যাদুকাটা, ধোপাজান ও চেলা নদীসহ বিভিন্ন বালুমহাল থেকে প্রতিদিন প্রায় তিন কোটি টাকা অবৈধভাবে আদায় করা হয়। প্রতিবেদনে ওই অর্থের ৫০ শতাংশ বিএনপি, ১৫ শতাংশ আওয়ামী লীগ এবং বাকি ৩৫ শতাংশ স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও সাংবাদিকদের মধ্যে ভাগ হওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে বালু উত্তোলন, ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কার্যক্রম চালানো, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক যোগসাজশের বিষয়ে তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে বালিজুরি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজাদ হোসেন বলেন, বর্তমানে আওয়ামী লীগের কেউ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত নন। তাঁর দাবি, নুরুল ইসলাম ও কামরুজ্জামান কামরুলের পক্ষ হয়ে নাছির ও রুবেল বালু-পাথর উত্তোলন এবং খাস কালেকশনের কাজ করছেন। নাছির মন্ত্রণালয় থেকে খাস কালেকশনের অনুমতি পেয়েছেন বলেও তিনি দাবি করেন।

তবে সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, কেউ তাঁর নাম ব্যবহার করে থাকতে পারেন, কিন্তু তিনি কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নন।

সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। সুনামগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন মিলনের বক্তব্য জানতে ফোন করা হলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি। পরে মোবাইল ও হোয়াটসঅ্যাপে বক্তব্য চেয়ে বার্তা পাঠানো হলেও তাঁর কাছ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, বালু উত্তোলনের সময়সীমা বাড়ানোর জন্য নাছির ও রুবেল হাইকোর্টে রিট করেছিলেন। বিষয়টি আইনগতভাবে মোকাবিলায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) অ্যাটর্নি জেনেলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পাশাপাশি বালু উত্তোলনে অনিয়মের বিরুদ্ধে জেলা ভূমি ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসক জানান, রিটে দেওয়া স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ভূমি মন্ত্রণালয় গত ২২ সেপ্টেম্বর তাহিয়া স্টোন ক্রাশারের নাছিরকে ক্ষতিগ্রস্ত ইজারাদার হিসেবে বাংলা ১৪৩৩ সনের অবশিষ্ট সময়ের জন্য যাদুকাটা নদী থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেয়। ওই আদেশের বিরুদ্ধে জিনান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শাহ রুবেল আহমেদ হাইকোর্টে রিট করলে আদালত মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট আদেশের ওপর তিন মাসের স্থগিতাদেশ দেন।

মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান আরও বলেন, পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে ১ অক্টোবর জেলা ভূমি ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা হওয়ার কথা থাকলেও ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। বিষয়টি ভূমিমন্ত্রী ও সচিবকেও জানানো হয়েছে।

যাদুকাটার বালুমহালকে ঘিরে একাধিক বড় গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, নাছির ও রুবেল আগে একই গ্রুপে থাকলেও বর্তমানে তারা আলাদা গ্রুপে কাজ করছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তাহিয়া স্টোন ক্রাশারের নাছির সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্যের সঙ্গে এবং জিনান এন্টারপ্রাইজের রুবেল সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্যের পক্ষে কাজ করছেন বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। উদ্ভূত পরিস্থিতির সমাধানে বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে জেলা প্রশাসন।