একসময় জীবিকার তাগিদে সুন্দরবনের সম্পদের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন সেই বনের পাশের গ্রামেই পর্যটনকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে আয়ের নতুন পথ। গড়ে উঠেছে পরিবেশবান্ধব ইকো-রিসোর্ট, স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, সচল হয়েছে গ্রামীণ অর্থনীতির নানা কর্মকাণ্ড। তবে ১৫টি ইকো-রিসোর্ট বন্ধের নির্দেশে সম্ভাবনাময় এই উদ্যোগের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। এতে প্রায় দুই হাজার মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

খুলনার দাকোপ উপজেলার সুন্দরবন-সংলগ্ন প্রায় ১৭ কিলোমিটার এলাকায় গড়ে ওঠা এসব রিসোর্ট বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রিসোর্ট উদ্যোক্তা ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের মতে, পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন মেনে পর্যটন কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল মানুষের বিকল্প আয়ের পথও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২১ সাল থেকে উপজেলার কৈলাশগঞ্জ ও বাণীশান্তা ইউনিয়নের তিনটি গ্রামে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে ইকো-রিসোর্ট গড়ে ওঠে। এসব প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপকসহ বিভিন্ন পদে গ্রামের মানুষ কাজ করছেন। প্রতিটি রিসোর্টে ৮ থেকে ২০ জন পর্যন্ত কর্মী রয়েছেন। রিসোর্টের বাইরে পর্যটকদের খাবার সরবরাহ, নৌকা পরিচালনা, মাঝি হিসেবে কাজ এবং যাতায়াতের ব্যবস্থা করেও আয় করছেন অনেকে।

পর্যটকদের প্রয়োজনীয় খাবার কিনতে স্থানীয় বাজারের ওপর নির্ভর করেন রিসোর্ট উদ্যোক্তারা। সুন্দরবনে যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত হয় গ্রামের নৌকা ও মাঝিদের সেবা। সড়কপথে চলাচলের জন্যও স্থানীয় যানবাহন কাজে লাগানো হয়। ফলে পর্যটন খাতের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী ও সেবাদানকারীরা। উদ্যোক্তাদের দাবি, এসব উদ্যোগের ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতির সঞ্চার হয়েছে। কিছু রিসোর্টের উদ্যোগে শিশুদের জন্য ছোট পাঠশালা গড়ে তোলা হয়েছে এবং স্থানীয়দের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও পরিচালিত হচ্ছে।

ইরাবতী ইকো-রিসোর্ট অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের ব্যবস্থাপক পলাশ মণ্ডল বলেন, আগে এলাকার মানুষ জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে সুন্দরবনের সম্পদ আহরণের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। বৈধ-অবৈধভাবে বনজ সম্পদ সংগ্রহ করতে হতো তাদের। ইকো-রিসোর্ট গড়ে ওঠার পর স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে সুন্দরবনের সম্পদের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রায়ও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

রিসোর্ট ওনার অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের (রোয়াস) সভাপতি ইমন ইসলাম বলেন, রিসোর্ট বন্ধের নির্দেশের বিষয়ে তারা বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছেন। তবে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি সরাসরি তাদের কাছে আসেনি। আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি মোকাবিলা করে রিসোর্ট পরিচালনা করতে চান তারা।

তিনি বলেন, এসব রিসোর্টে অবস্থান করে দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। পর্যটকদের প্রয়োজনীয় সেবা স্থানীয়ভাবে সরবরাহ করায় গ্রামের মানুষ আর্থিকভাবে উপকৃত হচ্ছেন। তার মতে, রিসোর্টগুলো বন্ধ করার পরিবর্তে পরিবেশগত শর্ত ও প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন মেনে পরিচালনার সুযোগ তৈরি করা হলে পর্যটনশিল্পের বিকাশের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবিকাও সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে।

সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনের সম্ভাবনা সম্পর্কে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক মো. ওয়াসিউল ইসলাম বলেন, পরিবেশবান্ধব পর্যটনশিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। এর মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ এবং যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে পর্যটন কার্যক্রমের কারণে বন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা এবং স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ, পর্যটন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও রিসোর্ট উদ্যোক্তাদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। পরিবেশগত শর্ত মেনে রিসোর্ট পরিচালনা, নিয়মিত তদারকি এবং পর্যটকদের জন্য দায়িত্বশীল ভ্রমণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এ খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব। এতে সুন্দরবনের সুরক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশের পথও উন্মুক্ত থাকতে পারে।